Tuesday, April 21, 2015

ফরয সালাত শেষে কি দুয়া পড়তে হবে?

ফরয সালাত শেষে কি দুয়া পড়তে হবে?

বিসমিল্লাহ। ওয়ালহা'মদুলিল্লাহ। ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আ'লা রাসূলিল্লাহ। আম্মা বা'দ।
চলুন জেনে নেই ফরয নামাযে সালাম ফিরানোর পরে মাসনুন (রাসুলুল্লাহ সাঃ নিয়মিতকরতেন এমন সুন্নাহ) দুয়া ও যিকির কোনগুলি....

ফরযনামাযের পরের দুয়াগুলো যদি কেউ পড়ে তাহলে ফরয নামায শেষ করেই পড়তে হবে, অন্যান্যসুন্নত/নফল নামায পড়ে নয়। আর যিকিরগুলো আরবীতেই করতে হবে। উল্লেখ্য এই সময়মাথায়/কপালে হাত দিয়ে দুয়া করা যাবেনা, বা আকাশের দিকেও তাকানোর প্রয়োজন নেই।
এইদুয়াগুলো করা সুন্নত, ফরয নয়। তবে চেষ্টা করা উচিত, সবার নিজেদের সময় ও সাধ্য অনুযায়ীযতগুলো দুয়া সম্ভব হয় তার উপর আমল করা। যার পক্ষে যতগুলো সম্ভব ও ভালো লাগে।

রাসুলুল্লাহ(সাঃ) ফরয সালাত শেষকরে যেই দুয়াগুলো পড়তেনঃ
১. “আসতাগফিরুল্লা-হ” - ৩ বার ।

أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ

অর্থঃ হে আল্লাহ!আমি তোমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করছি।

৩.“আল্লাহুম্মা আনতাস সালাম ওয়া মিনকাস সালাম, তাবা-রাকতা ইয়া যাল-জালা-লী ওয়াল ইকরাম” – ১ বার। 

اللَّهُمَّ أَنْتَ السَّلاَمُ، وَمِنْكَ السَّلاَمُ، تَبَارَكْتَ يَا ذَا الْجَلاَلِ وَالْإِكْرَامِ

অর্থঃ হেআল্লাহ্‌! তুমি শান্তিময়, তোমারকাছ থেকেই শান্তি অবতীর্ণ হয়। তুমি বরকতময়, হে পরাক্রমশালী ও মর্যাদা প্রদানকারী।
সাওবান(রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন “রাসুল (সাঃ) যখন সালাম ফেরাতেন তখন তিনি তিনবারইস্তেগফার পড়তে্ন অর্থাত ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলতেন। তারপর বলতেনঃ “আল্লাহুম্মাআনতাস সালাম ওয়া মিনকাস সালাম, তাবারাকতাইয়া যাল-জালা-লী ওয়াল ইকরাম”।
মুসলিম১/২১৮, আবু দাউদ ১/২২১, তিরমিযী ১/৬৬।

৪.“লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহ্দা’হু লা শারীকা লাহু, লাহুল মুলকুওয়া লাহুল হা’মদু, ওয়া হুয়া আ’লা কুল্লি শাইয়িনক্বাদীর” - ১ বার। (মুসলিম ১২৪০)

لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَـرِيْكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ

৫. “আল্লাহুম্মা আ ই’ন্নী আ’লা যিকরিকা ওয়াশুকরিকা ওয়া হু’সনি ইবাদাতিকা” – ১ বার। এই দুয়া ইচ্ছাকরলে নামাযের ভেতরে সিজদাতে বা সালাম ফেরানোর আগে দুয়া মাসুরার সময়ও করা যায়।

اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ، وَشُكْرِكَ، وَحُسْنِ عِبادَتِكَ

অর্থঃ হেআল্লাহ! তুমি আমাকে তোমার স্মরণ, তোমার কৃতজ্ঞতা এবং তোমার সুন্দর ইবাদত করার ব্যাপারে আমাকে সাহায্যকর”।
এই দুয়াটাএতো গুরুত্বপূর্ণ যে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এক সাহাবীকে এই দুয়া পড়ার জন্য বিশেষভাবেওয়াসীয়ত করে যান।
রাসুলুল্লাহ(সাঃ) মুয়ায বিন জাবাল (রাঃ) এর হাত ধরে বলেছিলেনঃ ‘‘হে মুয়াজ! আল্লাহর কসমআমি তোমাকে ভালোবাসি। অতঃপর তিনি বললেন, হে মুয়াজ! আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি যেতুমি প্রত্যেক সালাতের পর এই দুয়া করা ত্যাগ করবেনা, “আল্লাহুম্মাআ ই’ন্নী আ’লা যিকরিকা ওয়া শুকরিকা ওয়া হু’সনি ইবাদাতিকা।”
আবু দাউদ১/২১৩, নাসায়ী, ইবেন হিব্বান, হাদীস সহীহ।

৬. আয়াতুল কুরসী (সুরা বাক্বারা আয়াতঃ ২৫৫)১ বার।
আবু উমামা(রাঃ) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ
“যেব্যক্তি প্রত্যেক ফরয সালাতের পর ‘আয়াতুল কুরসী পাঠ করে মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই তাকেজান্নাতে প্রবেশ করা থেকে বিরত রাখতে পারবেনা”।
নাসায়ী,ইবনু হিব্বান, হাদীস সহীহ।

এছাড়াও আরোঅন্যান্য অনেক দুয়া ও যিকির আছে ফরয নামাযের পরে – যার যার সামর্থ্য ও পছন্দনীয় সেইগুলো করবেন ইন শা’ আল্লাহ। আপনারা সহীহ দুয়াগুলো পাবেন “হিসনুল মুসলিম” বইয়ের “সালামফিরানোর পরের দুয়া” অধ্যায়ে ও রিয়াদুস সালেহীন বইয়ের “যিকির/দুয়া” অধ্যায়ে।

***তাসবীহ, তাহমীদও তাকবীরঃ
প্রত্যেক ফরযসালাতের পর মাসনুন অনেক দুয়া ও আমল আছে, তার মধ্যে বিশেষ একটা হলো তাসবীহ, তাহমীদও তাকবীরগুলো ৩৩ বার করে পড়া। যাদের জন্য ৩৩ বার করে পড়া কঠিন মনে হয় বা ৩৩ বারকরে পড়তে পারেন না, তারা ১০ বার করেও পড়তে পারেন, সুন্নতের মাঝে এটাও আছে।
নিঃসন্দেহে ৩৩ বারকরে পড়াই উত্তম ও সওয়াব অনেক বেশি। তাই যারা ৩৩ করে পড়তে পারেন তারা ৩৩ বার করেইপড়বেন। আর যারা ৩৩ বার পড়তে পারবেন না তারা অন্তত ১০বার মোট ৩০ বার পড়তে পারেন ইনশা' আল্লাহ।

***আমি ৩৩বার করেপড়া ও ১০ বার করে পড়ার হাদীসগুলো দিয়ে দিচ্ছিঃ

সুবহা’নাল্লাহ (৩৩বার) , আলহামদুলিল্লাহ (৩৩ বার), আল্লাহু-আকবার (৩৪ বার)। (মুসলিম ১/২১৯, তিরমিযী২/১৭৮)

# আবু হুরাইরা(রাঃ) থেকে বর্ণিত আছে যে, একবার দরিদ্র মুহাজিররা রাসুলু্‌ল্লাহ (সাঃ) এর নিকটএসে বললেনঃ ধনবানরা তো সমস্ত বড় মর্যাদাগুলো দখল করে নিলেন এবং স্থায়ী নিয়ামতগুলোতাদের ভাগে পড়ল। আমরা যেমন নামায পড়ি তারাও তেমনি নামায পড়ে, আমরা যেমন রোযারাখি তারাও তেমনি রোযা রাখে, কিন্তু ধন-সম্পদের দিক থেকে তারা আমাদের অপেক্ষাঅগ্রসর। ফলে তারা হজ্জ করে, উমরা করে, আবার জিহাদ করে এবং সাদকাও করে। তিনি (সাঃ)বললেনঃ আমি কি তোমাদেরকে এমন বস্তু শিক্ষা দেবো না? যার ওপর আমল করে তোমরা নিজেদেরঅপেক্ষা অগ্রবর্তীদেরকে ধরে ফেলবে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীদের থেকেও এগিয়ে যাবে,আর তোমাদের মতো ঐ আমলগুলো না করা পর্যন্ত কেউ তোমাদের অপেক্ষা অগ্রবর্তী হবে না।তারা বললেনঃ ইয়া রাসুলুল্লাহ! অবশ্যই বলে দিন। তিনি বললেনঃ তোমরা প্রত্যেকনামাযের পর ৩৩ বার তাসবীহ, তাহমীদ ও তাকবীর পড়ো। বর্ণনাকারী আবু সালিহ সাহাবী(রহঃ) আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন যে, যখন তাকে ঐ কালেমা গুলো পড়ারনিয়ম সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, তিনি বললেনঃ এ কালেমা গুলো সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ(সাঃ) বলেছেন, “সুবহানাল্লাহ, ওয়াল হামদুলিল্লাহ ওয়াল্লাহু আকবার” অবশেষে এপ্রত্যেকটি কালেমাই হবে ৩৩ বার। (বুখারী ও মুসলিম)।
ইমাম মুসলিমের হাদীসেআরও আছেযে, দরিদ্র মুহাজিরগণ পুনরায় রাসুল (সাঃ) এর খেদমতে হাযির হয়ে বললেন,আমরা যা কিছু করছিলাম আমাদের ধনী ভাইরা তা শুনে নিয়েছে এবং তারাও তা করতে শুরুকরেছে। রাসুল (সাঃ) বললেনঃ এটা হচ্ছে আল্লাহর অনুগ্রহ, যাকে ইচ্ছা তাকে তিনি তাদান করেন। হাদীসে উল্লেখিত “আদ-দাসূর” শব্দটি “দাসর”-এর বহুবচন। “দাসর” অর্থ“বিপুল ঐশ্বর্য”।

# আবু হুরাইরা(রাঃ) রাসুলুল্লাহ (সাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেনঃ যে ব্যক্তি প্রত্যেকনামাযের পর ৩৩ বার ‘সুবহানাল্লাহ’ ৩৩ বার ‘আল হামদুলিল্লাহ’ ৩৩ বার ‘আল্লাহুআকবার’ পড়ে এবং ১০০ বার পূর্ণ করার জন্য একবার “লা- ইলা- হা ইল্লাল্লা- হু ওয়াহদাহু লা- শারীকা লাহু লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িনকাদীর” পড়ে, তার সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করে দেয়া হয়, যদিও তা সাগরের ফেনাপুঞ্জেরসমতুল্য হয়। (মুসলিম)।

# কা’ব ইবনে উজরাহ(রাঃ) রাসুলুল্লাহ (সাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি বলেছেন, (নামাযের) পরে পঠিতকয়েকটি কালেমা এমন আছে যেগুলো পাঠকারী অথবা (বলেন) সম্পাদনকারী ব্যর্থ হয় না। সেকালেমাগুলো হচ্ছেঃ প্রত্যেক ফরয নামাযের পর ৩৩ বার ‘সুবহানাল্লাহ’ ৩৩ বার ‘আলহামদুলিল্লাহ’ ও ৩৪ বার ‘আল্লাহু আকবার’। (মুসলিম)।
বিঃদ্রঃ ১০০ বারপূরণ করার জন্য আল্লাহু আকবর ৩৪বার পড়া যেতে পারে অথবা আল্লাহু আকবর ৩৩বার পড়েশেষে একবার “লা- ইলা- হা ইল্লাল্লা- হু ওয়াহ দাহু লা- শারীকা লাহু লাহুল মুলকুওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইয়িন কাদীর” পড়া যাবে। দুইটাই হাদীসেএসেছে, যেকোনো একটা করলে হবে।

১০বার করে পড়ারহাদীসঃ
'আবদুল্লাহ ইবনু'আমর (রাযিঃ) হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলেছেনঃ কোন মুসলমান ব্যক্তি দুইটি অভ্যাসে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হতে পারলে সেনিশ্চয়ই জান্নাতে প্রবেশ করবে। জেনে রাখ! উক্ত বৈশিষ্ট্যগুলো আয়ত্ত করা সহজ। সেঅনুসারে অনেক অল্প সঙ্খক লোকই টা আমল করে থাকে। (১) প্রতি ওয়াক্তের (ফরয) নামাযেরপর দশ বার সুবহানাল্লাহ, দশবার আলহামদুলিল্লাহ্ ও দশ বার আল্লাহু আকবার বলবে।'আবদুল্লাহ (রাযিঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে আমিনামাযের পর স্বীয় হস্তে গণনা করতে দেখেছি। তারপর রাসূলুল্লাহ্ (সাল্লাল্লাহুআলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ (পাঁচ ওয়াক্তে) মুখের উচ্চারণে একশত পঞ্চাশবার এবংমীযানে (দাঁড়িপাল্লায়) দেড় হাজার হবে। (২) আর ঘুমাতে যাওয়ার সময় তুমি"সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ্ ও আল্লাহু আকবার এক শত বার বলবে (প্রথম দুটি৩৩ বার ও শেষের টি ৩৪ বার মোট ১০০) ফলে টা মীযানে এক হাজারে রূপান্তরিত হবে।তোমাদের মাঝে কে এক দিন ও রাতে দুই হাজার পাঁচশ গুনাহে লিপ্ত হয়? (অর্থাৎ এত গুলো পাপও ক্ষমা যোগ্য হবে);সাহাবীগণ বলেন, কোন ব্যক্তি সবসময় এরূপ একটি 'ইবাদাত কেন করবে না! রাসূলুল্লাহ(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেনঃ তোমাদের কেউ নামাযে অবস্থান থাকাকালেতার কাছে শয়তান এসে বলতে থাকে, এটা মনে কর, ওটা মনে কর। ফলে সেই নামাযী (শয়তানেরধোঁকাবাজি থাকা মাঝেই রত অবস্থায়) নামাযে শেষ করে। আর উক্ত তাসবিহ আমল করার সেসুযোগ পায়না। পুনরায় তোমাদের কেউ শোয়ার জন্য শয্যা গ্রহণ করতে শয়তান তার নিকটএসে তাকে ঘুম পাড়ায় এবং সে তাসবিহ পাঠ না করেই ঘুমিয়ে পড়ে।
হাদিসটিসহিহঃ ইবনু মাজাহ/৯২৬।

সুরাহ মুলক তেলাওয়াত করার ফযীলত

সুরাহ মুলক তেলাওয়াত করার ফযীলতঃ
প্রতিদিন সুরাহ মুলক তেলাওয়াত করা গুরুত্বপূর্ণ একটি সুন্নত। অনেকে মনে করেন, সুরাহ মুলক শুধুমাত্র রাতের বেলাতেই পড়তে হবে, এটা ঠিক নয়। সুরাহ মুলক কেউ রাতের বেলা পড়লে সেটা উত্তম, তবে সুবিধামতো সময়ে দিনে বা রাতে, যেকোনো সময়েই তা পড়া যাবে। এই সুরার ফযীলত পাওয়ার জন্য হাদীসে যা বোঝানো হয়েছে হয়েছে তা হচ্ছে, এই সুরার দিকে বিশেষভাবে খেয়াল রাখা, সুরাটি মুখস্থ করা, এর অর্থ বোঝা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সুরাটি নিয়মতি পড়া। সুরাটি মুখস্থ করে সালাতে পড়তে পারেল ভালো। তবে মুখস্থ না থাকলে, সালাতের বাইরে দেখে দেখে পড়লেও এই সুরার পূর্ণ ফযীলত পাওয়া যাবে।
নাবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম প্রতিদিন সুরা মুলক পড়তেনঃ
জাবির রাদিয়াল্লাহ আনহু থেকে বর্ণিত। “নাবী সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম সুরাহ ‘আলিফ লাম মীম তানজিলুল কিতাব’ (সুরাহ আস-সাজদা) ও ‘তাবারাকাল্লাযী বিয়াদিহিল মুলকু’ (সুরা মুলক) না পড়ে ঘুমাতেন না।”
হাদীসটি সহীহঃ তিরমিযী ২৮৯২, মুসনাদে আহমাদ ১৪৬৫৯, সুনানে দারেমি। তাহক্বীকঃ শায়খ শুয়া’ইব আরনাউত্ব বলেন, হাদীসটি সহীহ। শায়খ আহমাদ শাকির বলেন (হা/১৪৫৯৪) এর সানাদ সহীহ। বুখারীর ‘আদাবুল মুফরাদ’ নাসায়ীর ‘আমালুল ইয়াওমি ওয়াল লাইলাহ’, সিলসিলাহ সহীহাহ হা/৫৮৫, শায়খ আলবানী বলেনঃ হাদীসটি সহীহ।
সুরাহ মুলক নিয়মিত পাঠ করলে কবরের আজাব থেকে রক্ষা করবেঃ
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহ আনহু থেকে বর্ণিত। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “সুরাহ মুলক (তিলাওয়াতকারীকে) কবরের আজাব থেকে প্রতিরোধকারী।”
হাদীসটি হাসান সহীহঃ হাকিমঃ ৩৮৩৯, তাবাকাতে আসবাহানিয়্যিনঃ ২৬৪। ইমাম হাকিম ও ইমাম যাহাবী হাদীসটির সনদকে সহীহ বলেছেন। শায়খ আলবানীর মতে হাদীসটি হাসান সহীহ, সিলসিলাতুল আহাদীস সহীহাহঃ ১১৪০।
আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহ আনহু বলেন, “যে ব্যক্তি প্রত্যেক রাতে ‘তাবারাকাল্লাযী বিয়াদিহিল মুলকু’ (সুরাহ মুলক) পাঠ করবে এর মাধ্যমে মহীয়ান আল্লাহ তাকে কবরের আজাব থেকে রক্ষা করবেন। সাহাবায়ি কিরাম বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এর যামানায় এই সুরাটিকে আমরা ‘কবরের আজাব থেকে রক্ষাকারী আল-মানিআ’হ’ বা সুরক্ষাকারী বলতাম। সুরাহ মুলক মহান আল্লাহর কিতাবের এমন একটি সুরাহ, যে ব্যক্তি প্রতি রাতেই এই সুরাটি পাঠ করে সে অধিক করলো এবং অতি উত্তম কাজ করলো।”
হাদীসটি হাসান সহীহঃ সুনানে আন-নাসায়ী ৬/১৭৯। শায়খ আলবানীর মতে হাদীসটি হাসান সহীহ, সহীহ আত-তারগীব ওয়াল তারহীব ১৪৭৫, ইমাম হাকিম ও ইমাম যাহাবী হাদীসটির সনদকে সহীহ বলেছেন
সুরাহ মুলক পাঠ করলে কিয়ামতের দিন সুপারিশ করে জান্নাতে নিয়ে যাবেঃ
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “কুরআনে ত্রিশ আয়াত বিশিষ্ট এমন একটি সুরাহ আছে, যা তার পাঠকারীর জন্য সুপারিশ করবে এবং শেষা পর্যন্ত তাকে ক্ষমা করে দেওয়া হবে। আর সেটা হলো ‘তাবা-রাকাল্লাযী বিয়াদিহিল মুলক’ (সুরাহ মুলক)।”
হাদীসটি হাসান সহীহঃ তিরমিযী ২৮৯১, সুনানে আবু দাউদ ১৪০০, ইবনে মাজাহ ৩৭৮৬, মুসনাদে আহমাদ। ইমাম তিরমিযী বলেছেন হাদীসটি হাসান, ইবনে তাইমিয়্যা বলেছেন সহীহ মাজমুঃ ২২/২২৭, শায়খ আলবানীর মতে হাদীসটি সহীহ, সহীহ তিরমিযী ৩/৬, সহীহ ইবনে মাজাহ ৩০৫৩।
সুরাহ মুলক তেলাওয়াত করা নিয়ে কিছু কথাঃ
এইখানে তেলাওয়াত করা মানে শুধু তোতা পাখির মতো রিডিং পড়ে যাওয়া না। এ প্রসংগে সউদী আরবের স্থায়ী ফতোয়া বোর্ডের সম্মানিত আলেমদের ফতোয়া হচ্ছে, “(সুরা মুলক নিয়ে সবগুলো) হাদীসের আলোকে বলা যায় যে, যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সুরাহ মুলক বিশ্বাস করবে এবং নিয়মিত তেলাওয়াত করবে, এই সুরাহ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করবে এবং যে সুরাটিতে যে হুকুম-আহকাম দেওয়া আছে সেইগুলো মেনে চলবে, কেয়ামতের দিন তার জন্য এই সুরাটি শাফায়াত বা সুপারিশ করবে।” [ফতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দায়িমাহঃ ৪/৩৩৩, ৩৩৫]
সুতরাং, এই সুরাহটি নিয়মিত তেলাওয়াত করার পাশাপাশি, সুরাটির তর্জমা ও তাফসীর জানতে হবে, আয়াতগুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করতে হবে এবং সেই অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে হবে। আল্লাহ তাআ’লা আমাদের সকলকে সেই তোওফিক দান করুন, আমিন।

ওযুর পরে সহীহ দুয়া ৩টি

ওযুর পরে সহীহ দুয়া ৩টি
১. ওযু শেষ করে কালিমা শাহাদাত একবার পড়তে হবে,
أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَـهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيْكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ.
উচ্চারণঃ আশহাদু আল্-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্দাহু লা শারিকা-লাহু ওয়াআশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু।
অর্থঃ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া আর কোন মাবূদ নেই, তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে ব্যক্তি পূর্ণভাবে ওযু করবে এবং কালিমা শাহাদাত পাঠ করবে, তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজাই খুলে দেয়া হবে। সে যেটা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারবে
মুসলিম ১/২০৯, মিশকাতঃ ২৮৯।
কালেমা শাহাদাত পড়ার সময় আকাশের দিকে তাকানোর প্রয়োজন নেই, এ সম্পর্কিত হাদীস মুনকার বা যঈফ। [শায়খ আলবানী, ইরোয়াউল গালীল ১/১৩৫]
২. এছাড়া আরো একটি দুয়া পড়া যায়, যেমন
اَللَّهُمَّ اجْعَلْنِيْ مِنَ التَّوَّابِيْنَ وَاجْعَلْنِيْ مِنَ الْمُتَطَهِّرِيْنَ.
উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মাজ আলনী মিনাত তাওয়্যাবীনা ওয়াজ আলনী মিনাল মুতা-ত্বাহহিরীন।
অর্থঃ হে আল্লাহ! তুমি আমাকে তওবাকারী ও পবিত্রতা অর্জনকারীদের অন্তর্ভুক্ত করো।
তিরমিযী ১/৭৯।
৩. ওযু শেষ করে ৩য় এই দুয়াটি পড়া সুন্নত
«سُبْحانَكَ اللَّهُمَّ وَبِحَمْدِكَ، أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ، أَسْتَغْفِرُكَ وَأَتوبُ إِلَيْكَ»
উচ্চারণঃ সুবহানাকা আল্লা-হুম্মা ওয়া বিহামদিকা আশহাদু আল লা-ইলাহা ইল্লা আন্তা আস্তাগফিরুকা ওয়াআতূবু ইলাইকা।
অর্থঃ হে আল্লাহ! আপনার প্রশংসাসহ পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করছি। আমি সাক্ষ্য দেই যে, আপনি ছাড়া কোনো হক্ব ইলাহ নেই, আমি আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং আপনার নিকট তওবা করছি।

নাসাঈ, আমালুল ইয়াওমি ওয়াল লাইলাহ, পৃ. ১৭৩। আরও দেখুন, ইরওয়াউল গালীল, ১/১৩৫, ৩/৯৪।

নামাযের রুকন, ওয়াজিব, সুন্নত ও নামায ভংগের কারণসমূহ

নামাযের রুকন, ওয়াজিব, সুন্নত ও নামায ভংগের কারণসমূহ
__________________________________
নামাযে রুকন হচ্ছে মোট ১৪টিঃ
১. সামর্থ্য থাকলে দাঁড়িয়ে নামায পড়া।
২. তাকবীরে তাহরীমাহ অর্থাৎ আল্লাহু আকবার বলে নামায শুরু করা।
৩. প্রত্যেকে রাকাতেই সুরা ফাতিহা পাঠ করা।
৪. রুকু করা।
৫. রুকু থেকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়ানো।
৬. (দুই হাত, দুই পা, দুই হাঁটু ও মুখমন্ডল এই) সাতটি  অঙ্গের উপর সিজদা করা।
৭. সিজদা হতে উঠা।
৮. দুই সিজদার মাঝখানে পিঠ সোজা করে বসা।
৯. শেষ বৈঠকে তাশাহ্হুদ (আত্তাহিয়্যাতু...) পড়া।
১০. তাশাহ্হুদ পড়ার সময় বসে থাকা।
১১. নামাযের এই রুকনগুলো ধীর ও স্থিরতার সাথে সম্পাদন করা।
১২. এই রুকনগুলো ধারাবাহিকভাবে একটার পর একটা আদায় করা।
১৩. (শেষ বৈঠকে) নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর দরুদ পাঠ করা।
১৪. ডানে ও বামে দুই দিকে সালাম প্রদান করা বা সালাম ফিরিয়ে নামায শেষ করা।
__________________________________
নামাযের ওয়াজিব (বা ফরয) হচ্ছে মোট ৮টিঃ
১. তাকবীরে তাহরীমার তাকবীর ছাড়া নামাযে অন্যান্য তাকবীর সমূহ (আল্লাহু আকবার) বলা।
২. سَمِعَ اللهُ لِمَنْ حَمِدَهُ (সামিয়াল্লাহু লিমান হামিদাহ) বলা। আর ইহা ইমাম ও একাকী নামায আদায় কারীর জন্য ওয়াজিব। তবে মুক্তাদী তা পাঠ করবে না। (অবশ্য একদল আলেমের মতে মুক্তাদীও তা পড়তে পারে।)
৩. ইমাম, মুক্তাদী ও একাকী নামায আদায় কারী সকলের উপর رَبَّنَا وَلَكَ الْحَمْدُ (রাব্বানা ওয়া লাকাল হামদ) সকলের জন্যে বলা ওয়াজিব।
৪. রুকুতে سُبْحَانَ رَبِّيَ الْعَظِيمِ (সুব্হানা রাব্বিয়াল আজীম) বলা।
৫. সিজদায় سُبْحَانَ رَبِّيَ الْأَعْلَى (সুবহানা রাব্বিয়াল আলা) বলা।
৬. দুসিজদার মাঝে رَبِّ اغْفِرْلِي   (রাব্বিগ ফিরলী) বলা।
৭. প্রথম বৈঠকে তাহিয়্যাত (আত্তাহিয়্যাতু...) পড়া। 
৮. প্রথম বৈঠকের জন্য বসা
__________________________________
নামাযের সুন্নাত সমূহ হচ্ছেঃ
১. সানা বা প্রারম্ভিক দুআ পাঠ করা।
২. ডান হাতকে বাম হাতের উপর করে দাঁড়ানো অবস্থায় রুকুর পূর্বে ও পরে বুকের উপর রাখা।
৩. দুই হাতের আঙ্গুল মিলিত ও দণ্ডয়মান অবস্থায় অবস্থায় কাধঁ অথবা দুই কানের লতি পর্যন্ত তুলে ইশারা করা, তাকবীরাতুল ইহরামের সময়, রুকু করার সময়, রুকুহতে উঠার সময় ও প্রথম বৈঠক হতে তৃতীয় রাকাআতের জন্যে দাঁড়ানের সময়।
৪. রুকু ও সিজাদার তাসবীহ সমূহের একের অধিকবার পাঠ করা।
৫. দুই সিজদার মাঝে মাগফিরাত বা ক্ষমার জন্য দুআ একবারের অধিক পাঠ করা।
৬. রুকুতে মাথাকে পিঠের বরাবর বা সমান্তরাল রাখা।
৭. সিজদারত অবস্থায় দুই হাতকে পার্শদ্বয় হতে, পেটকে উরুদ্বয় হতে ও উরুদ্বয়কে পায়ের নলীদ্বয় হতে দূরে রাখা।
৮. (নারী ও পুরুষের উভয়ের জন্য) সিজদার সময় জমিন হতে দুই হাতকে উঁচু করে রাখা।
৯. প্রথম বৈঠকে ও দুই সিজাদার মাঝখানে ডান পা খাড়া রেখে বাম পা বিছিয়ে তার উপর বসা। (প্রথম বৈঠকে পুরুষদের মতো করে বসা, নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য সুন্নাহ)। 
১০. তিন ও চার রাকআত বিশিষ্ট নামাযের শেষ বৈঠকে তাওয়াররুক করা। তাওয়াররুকের নিয়ম হল, বাম পা কে ডান পায়ের নলীর নিচে রাখা, অতঃপর ডান পায়ের পাতা খাড়া রেখে নিতম্বের উপর বসা। (দ্বিতীয় বৈঠকে নারীদের মতো করে বসা, নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য সুন্নাহ)।
১১. প্রথম ও দ্বিতীয় বৈঠকে তাশাহুদের বসার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত শাহাদত আঙ্গুলী দ্বারা ইশারা করা ও দুআর সময় নড়ানো।
১২. প্রথম বৈঠকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তার পরিবারের উপর এবং ইব্রাহীম ও ইব্রাহীম আলাইহিস সলাতু ওয়াস সালামের  পরিবারের উপর সলাত ও বরকত বর্ষণ করা।  অর্থাৎ, ২টি বৈঠকের নামাযের প্রথম বৈঠকে দুরুদে ইবরাহীম পাঠ করা সুন্নাহ।
১৩. শেষ বৈঠকে দুআ মাসুরা পড়া।
১৪. ফজরের নামাযে, জুমুআর নামাযে, দুই ঈদের নামাযে, বৃষ্টি প্রার্থনার নামাযে এবং মাগরিব ও এশার নামাযের প্রথম দুই রাকআত ফরয নামাযে উচ্চ স্বরে সুরা-ক্বিরাত পাঠ করা।
১৫. যুহর, আসর ও মাগরিবের তৃতীয় রাকআতে এবং এশার সলাতের শেষ দুই রাকআতে চুপিস্বরে সুরা-ক্বিরাত পাঠ করা।
১৬. সূরা ফাতিহা পড়ার পর ক্বুরআনের অন্য স্থান থেকে (সুরা বা আয়াত) পাঠ করা।
নামাযের যে সুন্নাতগুলো আমরা উল্লেখ করেছি, তা ছাড়াও হাদীসে বর্ণিত অন্যান্য সুন্নাতগুলোর প্রতি লক্ষ্য রাখা উচিত। যেমন- ইমাম, মুক্তাদী ও একা একা সলাত আদায়কারীর রুকু হতে উঠে রব্বানা ওয়া লাকাল হামদু এর অতিরিক্ত দুয়া পাঠ করা, এটি সুন্নাত। আরও তার (নামাযের সুন্নাতের) অন্তর্ভূক্ত হচ্ছে, রুকুর সময় দুই হাতের অঙ্গুলগুলো ছাড়ানো বা আলাদা অবস্থায় রেখে দুই হাঁটুকে মজবুতভাবে আকড়ে ধরা। আরো হচ্ছে, সিজদার সময় অঙ্গুলগুলো মিলিত রাখা, নাক মাটিতে লাগিয়ে রাখা. . .ইত্যাদি।
__________________________________
যে সকল কারণে নামায নষ্ট হয়, সেগুলো হচ্ছে মোট ৮টিঃ
১. নামাযে মাসলাহাতের (কল্যাণ মূলক) বহির্ভূত এমন বিষয়ে স্বরণ ও জানা থাকা অবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে কথা বলা। তবে মনের ভুলে অথবা কোন মূর্খ ব্যাক্তি না জেনে কথা বলে ফেললে, তার নামায বাতিল হবে না।
২.  নামাযে উচ্চস্বরে হাসা। তবে সামান্য মুচকি হাসা যা দেখে কেউ বুঝতে ন আপারে তবে তার কারনে নামায ভাংবেনা।
৩. নামাযের ভেতরে কোন কিছু খাওয়া।
৪. নামাযের ভেতরে কোন কিছু পান করা।
৫. নামায চলাকালীন সময় আওরাহ বা লজ্জাস্থান প্রকাশিত হওয়া।
৬. সলাতে ধারাবাহিকভাবে অনেক বেশী বেহুদা বা অনর্থক কাজ করা। (আর অধিক কাজের পরিমাণ নির্ণয় করার মানদণ্ড হল, কেউ তার দিকে তাকালে মনে হবে যেন, সে নামাযের মাঝে নয়)।
৭.  ক্বিবলার দিক থেকে ডান বা বাম দিকে অনেক বেশি সরে যাওয়া।
৮. নামাযের ভেতরে সালাম ফেরানোর পূর্বে যেকোণ সময়ে অযু ভেঙ্গে যাওয়া।
মূল উৎসঃ সারা বিশ্বের মুসলিমদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় পাঠ সমূহ
লেখকঃ ইমাম আব্দুল আজিজ বিন আব্দুল্লাহ বিন বায (রহঃ)।

নামাযে যে ৭টি স্থানে দু'আ করা যায়...

আমরা অনেকেই জানি, সালাতের সিজদাতে ও সালাম ফিরানোর আগে দুয়া করা যায়। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সালাতে মোট কতগুলো জায়গায় দুয়া করা যায়? সেইগুলো কি কি?
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সালাতে মোট ৭টি স্থানে দুয়া করতেন। সালাতে যেই ৭টি স্থানে দুয়া করা যায়ঃ
১. সানাঃ তাকবীর তাহরীমার আল্লাহু আকবার বলে বুকে হাত বাঁধার পরে, সালাত শুরুর দিকে সানা হিসেবে দুয়া পড়া যায়। এখানে নিজের পছন্দমতো যেকোনো দুয়া করা যায়না, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেই দুয়াগুলো করেছেন শুধু সেই দুয়াগুলোই করা যাবে। আর এইখানে দুয়াটা আরবীতেই করতে হবে।
প্রচলিত ভাষায় আমরা যাকে সানা বলি, সহীহ হাদীসে এখানে অন্য আরো সানা আছে, যেই সানাতে দুয়া আছে। সানা হিসেবে আমরা যেটা পড়ি এর পরিবর্তে ঐ দুয়ার সানা পড়া যাবে। বরং অনেক আলেম সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বর্ণিত সানার ঐ দুয়াটাকে বেশি ভালো বলে মত দিয়েছেন। আপনি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সানা হিসেবে দুয়াটার অর্থের দিকে লক্ষ্য করুন, তাহলে বুঝবেন কত সুন্দর দুয়া এটা। অলসতা করে মুখস্থ না করার কারণে আপনি মহামূল্যবান এই দুয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। চিন্তা করুন এতো সুন্দর ভাষায় আল্লাহর কাছে নিজের গুনাহ থেকে মাফ চেয়ে সালাত শুরু করলে আল্লাহ তা’আলা সেই সালাতকে কত বেশি পছন্দ করবেন! তাই প্রিয় বন্ধুরা! অলসতা বাদ দিয়ে কষ্ট করে এই দুয়াটা মুখস্থ করে মাঝে মাঝে পড়ার চেষ্ট করবেন। যখন সময় কম থাকে বা অলসতা লাগে তখন ছোট যেটা সুবহা’নাকা আল্লাহুম্মা...এটা পড়লেন আর যখন সময়, ইচ্ছা, শক্তি-সামর্থ্য আছে বা এমনিতেই একবার তোওবা করার ইচ্ছা সানা হিসেবে এই দুয়াটা পড়লেন। দুয়াটা হচ্ছেঃ
اللَّهُمَّ بَاعِدْ بَيْنِي وَبَيْنَ خَطَايَايَ كَمَا بَاعَدْتَ بَيْنَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ، اللَّهُمَّ نَقِّنِي مِنْ خَطَايَايَ كَمَا يُنَقَّى الثَّوْبُ الْأَبْيَضُ مِنَ الدَّنَسِ، اللَّهُمَّ اغْسِلْني مِنْ خَطَايَايَ، بِالثَّلْجِ وَالْماءِ وَالْبَرَدِ.
উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মা বাইয়ি’দ বাইনী ওয়া বাইনা খাত্বা-ইয়া-ইয়া কামা বা-‘আদতা বাইনাল মাশরিক্বি ওয়াল মাগরিব। আল্লা-হুম্মা নাক্কিনী মিন খাত্বা-ইয়া-ইয়া কামা ইয়ুনাক্কাস্ ছাওবুল আবইয়াদু মিনাদ দানাস। আল্লা-হুম্মাগসিলনী মিন খাত্বা-ইয়া-ইয়া বিস্‌সালজি ওয়াল মা-’ই ওয়াল বারাদ।
অর্থঃ হে আল্লাহ! আপনি আমার এবং আমার গুনাহসমূহের মাঝে এমন দূরত্ব সৃষ্টি করুন যেমন দূরত্ব সৃষ্টি করেছেন পূর্ব ও পশ্চিমের মাঝে। হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আমার গুনাহসমূহ থেকে এমনভাবে পরিষ্কার করে দিন, যেমন সাদা কাপড় ময়লা থেকে পরিষ্কার করা হয়। হে আল্লাহ! আপনি আমাকে আমার পাপসমূহ বরফ, পানি ও মেঘের শিলাখণ্ড দ্বারা ধৌত করে দিন।”
বুখারীঃ ৭৪৪, মুসলিমঃ ৫৯৮।
২. দুয়া কুনুতঃ কিরাত শেষ করে রুকুতে যাবার আগে দুয়া কুনুত পড়া সুন্নত। বিতির সালাতে ও সাময়িকভাবে ফজরের ফরয সালাতেও (মুসলিমদের বিপদ আপদ থেকে বাঁচার জন্য, অত্যাচারী কাফেরদের বদদুয়া করার জন্য অথবা উম্মাহর বিশেষ প্রয়োজন এমন সময়ে) দুয়া কুনুত পড়া সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমানিত। সবচাইতে সহীহ ও অর্থের দিক থেকে বেশি সুন্দর যে দুয়া কুনুত সেটা হচ্ছেঃ
اللَّهُمَّ اهْدِنِي فِيمَنْ هَدَيْتَ، وَعَافِنِي فِيمَنْ عَافَيْتَ، وَتَوَلَّنِي فِيمَنْ تَوَلَّيْتَ، وَبَارِكْ لِي فِيمَا أَعْطَيْتَ، وَقِنِي شَرَّ مَا قَضَيْتَ؛ فَإِنَّكَ تَقْضِي وَلاَ يُقْضَى عَلَيْكَ، إِنَّهُ لاَ يَذِلُّ مَنْ وَالَيْتَ، [وَلاَ يَعِزُّ مَنْ عَادَيْتَ]، تَبارَكْتَ رَبَّنا وَتَعَالَيْتَ
উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মাহদিনী ফীমান হাদাইতা ওয়া ‘আ-ফিনী ফীমান ‘আ-ফাইতা ওয়া তাওয়াল্লানী ফীমান তাওয়াল্লাইতা ওয়াবা-রিক লী ফীমা আ‘ত্বাইতা ওয়াক্বিনী শাররা মা ক্বাদাইতা ফাইন্নাকা তাক্ব‌্দ্বী ওয়ালা ইউক্ব্‌দ্বা ‘আলাইকা। ইন্নাহু লা ইয়াযিল্লু মাও ওয়া-লাইতা, [ওয়ালা ইয়া‘ইয্যু মান ‘আ-দাইতা।] তাবা-রক্‌তা রব্বানা ওয়া তা‘আ-লাইতা।
অর্থঃ হে আল্লাহ! আপনি যাদেরকে হেদায়াত করেছেন তাদের মধ্যে আমাকেও হেদায়াত দিন, আপনি যাদেরকে নিরাপত্তা প্রদান করেছেন তাদের মধ্যে আমাকেও নিরাপত্তা দিন, আপনি যাদের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেছেন, তাদের মধ্যে আমার অভিভাবকত্বও গ্রহণ করুন, আপনি আমাকে যা দিয়েছেন তাতে বরকত দিন। আপনি যা ফয়সালা করেছেন তার অকল্যাণ থেকে আমাকে রক্ষা করুন। কারণ আপনিই চূড়ান্ত ফয়সালা দেন, আপনার বিপরীতে ফয়সালা দেওয়া হয় না। আপনি যার সাথে বন্ধুত্ব করেছেন সে অবশ্যই অপমানিত হয় না [এবং আপনি যার সাথে শত্রুতা করেছেন সে সম্মানিত হয় না।] আপনি বরকতপূর্ণ হে আমাদের রব্ব! আর আপনি সুউচ্চ-সুমহান।”
সুনান গ্রন্থকারগণ, আহমাদ, দারামী ও বাইহাকী এ হাদীসটি সংকলন করেছেন। আবু দাউদঃ ১৪২৫, তিরমিযীঃ ৪৬৪, নাসাঈঃ ১৭৪৪, ইবন মাজাহঃ ১১৭৮, আহমাদঃ ১৭১৮, দারামীঃ ১৫৯২, হাকিমঃ ৩/১৭২, বাইহাকীঃ ২/২০৯। আর দু’ ব্রাকেটের মাঝখানের অংশ বাইহাকীর। শায়খ আলবানীর মতে হাদীসটি সহীহঃ ইরওয়াউল গালীলঃ ২/১৭২।
দেখা যাচ্ছে, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই দুয়াটি অনেকগুলো হাদীস গ্রন্থেই উল্লেখ করা হয়েছে। এথেকে এর মর্যাদা বোঝা যাচ্ছে। দুয়া কুনুতের দুয়াটা আরবীতেই করতে হবে।
৩. রুকু থেকে মাথা উঠিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়েঃ রুকু থেকে দাঁড়িয়ে নিজের পছন্দমতো যেকোনো দুয়া করা যায়না, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেই দুয়াগুলো করেছেন শুধু সেই দুয়াগুলোই করা যাবে। আর এইখানে দুয়াটা আরবীতেই করতে হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন রুকু থেকে মাথা উঠাতেন তখন দুয়া করতেন।
(আল্লামাহ ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম এখানে তার বইয়ে যেই দুয়াটা উল্লেখ করেছেন সেটা আমি খুঁজে পাইনি বলে দিতে পারলাম না, দুঃখিত)।
৪. রুকুতে দুয়া করা যায়ঃ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রুকুর মাঝেও দুয়া করতেন। তবে রুকুতে নিজে থেকে কোন দুয়া করা নিষিদ্ধ। শুধুমাত্র নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রুকুতে যেই দুয়া করেছেন সেই দুয়া করা যাবে। রুকুতে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেই দুয়া করেছেন তাহলঃ
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আ’নহা বলেন যেঃ সুরা নাসর নাযিল হওয়ার পর থেকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কখনো এই দুয়া পড়া ছাড়া সালাত পড়তে দেখিনি।
سُبْحَانَكَ اللَّهُمَّ رَبَّنَا وَبِحَمْدِكَ، اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي
উচ্চারণঃ সুবহা’নাকা আল্লা-হুম্মা রাব্বানা ওয়া বিহা’মদিকা আল্লা-হুম্মাগফিরলী।
অর্থঃ হে আল্লাহ! তুমি আমাদের রব্ব। তোমার পবিত্রতা ঘোষণা করি, তোমার প্রশংসা সহকারে। হে আল্লাহ! তুমি আমাকে ক্ষমা করে দাও।
সুবহা’নাকা – পবিত্রতা ঘোষণা করছি, রাব্বানা – হে আমাদের রব্ব, ওয়া = এবং, বিহা’মদিকা = প্রশংসা সহকারে, আল্লা-হুম্মা = হে আল্লাহ! আল্লা-হুম্মা + মাগফিরলী = আল্লা-হুম্মাগফিরলী, আল্লা-হুম্মা = হে আল্লাহ! মাগফিরলি = তুমি আমাকে ক্ষমা করো
এই দুয়া রুকু এবং সিজদা দুই জায়গাতেই পড়া যায়, ১/৩ করে। এই দুয়া পড়ার আগে তাসবীহগুলো পড়ে নিতে হবে।
দুয়াটার রেফারেন্স হলোঃ সহীহ মুসলিম ৯৬৯।
৫. সিজদাতে দুয়া করাঃ
সিজদায় দুয়া করা নিয়ে A-Z

৬. দুই সিজদার মাঝখানে বসা অবস্থায়ঃ এখানে নিজের পছন্দমতো যেকোনো দুয়া করা যায়না, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেই দুয়াগুলো করেছেন শুধু সেই দুয়াগুলোই করা যাবে। আর এইখানে দুয়াটা আরবীতেই করতে হবে।
ছোট্ট এই দুয়াটা কি মুখস্থ করা যায়না?
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফরয, সুন্নত, নফল যে কোনো সালাতের দুই সিজদার মাঝখানে বসা অবস্থায় এই দুআটি করতেনঃ
رَبِّ اغْفِرْ لِي، رَبِّ اغْفِرْ لِي
উচ্চারণঃ রাব্বিগ ফিরলি, রাব্বিগ ফিরলি।
অর্থঃ হে আমার রব আমাকে ক্ষমা করা, হে আমার রব আমাকে ক্ষমা কর।
আবু দাউদ ১/৩১, ইবনে মাজাহ, দুয়াটা সহীহ।
এই ছোট্ট দুয়াটা পড়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ মিস করা ঠিকনা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দিনে ৭০ থেকে ১০০ বার তোওবা করতেন। আপনি যদি সালাতের দুই সিজদার মাঝখানে এই দুয়াটা পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলেন তাহলে দিনে যত রাকাত করে সালাত পড়বেন, তত বারই আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া হবে। আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার একটা উপায় হচ্ছে বেশি বেশি করে নিয়মিত তোওবা ও ইস্তিগফার করা (ক্ষমা করা)।
এছাড়া আরেকটা ছোট্ট সুন্দর দুয়াঃ
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي، وَارْحَمْنِي، وَاهْدِنِي، وَاجْبُرْنِي، وَعَافِنِي، وَارْزُقْنِي، وَارْفَعْنِي
উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মাগফিরলী, ওয়ারহা’মনী, ওয়াহদিনী, ওয়াজবুরনী, ওয়াআ’ফিনি, ওয়ারযুক্বনী, ওয়ারফা‘নী।
অর্থঃ হে আল্লাহ! আপনি আমাকে ক্ষমা করুন, আমার প্রতি দয়া করুন, আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন, আমার সমস্ত ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করে দিন, আমাকে নিরাপত্তা দান করুন, আমাকে রিযিক দান করুন এবং আমার মর্যাদা বৃদ্ধি করুন”।
হাদীসটি ইমাম নাসাঈ ব্যতীত সুনান গ্রন্থগারগণ সবাই সংকলন করেছেন। আবূ দাউদঃ ৮৫০, তিরমিযীঃ ২৮৪, ২৮৫, ইবন মাজাহঃ ৮৯৮। শায়খ আলবানির মতে হাদীস সহীহ।
৭. দুয়া মাসুরাঃ তাশাহুদ (আত্তাহিয়্যাতু) ও দুরুদের পরে, সালাম ফিরানোর আগে দুয়া মাসুরা (হাদীসে বর্ণিত দুয়াগুলো) ও নিজের পছন্দমতো দুয়া করা যায়। ফরয সালাতের শেষ বৈঠকের দুয়া আল্লাহ বেশি কবুল করেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হল, ‘কোন দো‘আ সর্বাধিক শোনা (কবুল করা) হয়?’ তিনি বললেন, “রাত্রির শেষভাগে এবং ফরয নামায সমূহের শেষাংশে”।
তিরমিযী ৩৪৯৯, ইমাম তিরমিযী ও শায়খ আলবানীর মতে হাদীসটি হাসান সহীহ।
সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রয়োজনীয় দুয়া মাসুরা হচ্ছে ৪টি বিষয় থেকে আশ্রয় চাওয়ার দুয়া।
কবরের আজাব, জাহান্নামের আজাব, দুনিয়ার ফেতনা ও মৃত্যুর সময়ের ফেতনা ও দাজ্জালের ফেতনা থেকে নিরাপদ থাকার জন্য দুয়া মাসুরাঃ
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এইগুলো থেকে বাঁচার জন্য ফরয, নফল বা সুন্নত, যেকোনো সালাতে তাশাহুদ ও দুরুদের পরে সালাম ফিরানোর আগে এই দুয়া পড়তে বলেছেন।
اَللَّهُمَّ إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ، وَمِنْ عَذَابِ جَهَنَّمَ، وَمِنْ فِتْنَةِ الْمَحْيَا وَالْمَمَاتِ، وَمِنْ شَرِّ فِتْنَةِ الْمَسِيْحِ الدَّجَّالِ.
উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মা ইন্নী আ’উযুবিকা মিন আ’যাবিল ক্বাবরি ওয়া মিন আ’যাবি জাহান্নাম, ওয়ামিন ফিতনাতিল মাহ’ইয়া ওয়াল্ মামাতি, ওয়ামিন সাররি ফিতনাতিল্ মাসীহি’দ্-দাজ্জাল।
অর্থঃ হে আল্লাহ! তুমি আমাকে কাবরের আযাব থেকে রক্ষা করো,আমাকে জাহান্নামের আযাব, এবং দুনিয়ার ফিৎনা ও মৃত্যুর ফেতনা এবং দাজ্জালের ফিৎনা থেকে রক্ষা করো।
বুখারী ২১০২, মুসলিম ১/৪১২, হিসনুল মুসলিম, পৃষ্ঠা – ৯০।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুয়া মাসুরা হিসেবে এই দুয়াটা পড়তে সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছেন। এছাড়া আরো অনেক দুয়া মাসুরা আছে অথবা আরবীতে অন্য দুয়াগুলো এইখানে পড়তে পারবেন ইন শা আল্লাহ। এছাড়া কুরআন অথবা হাদীসে বর্ণিত অন্য দুয়াগুলো, রাব্বানা আতিনা...রাব্বির হামহুমা কামা...আল্লাহুম্মা ইন্নি আস আলুকাল জান্নাতে...এইরকম নিজের জন্য, মাতাপিতার জন্য, যেকোনো মুসলিমের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতের যেকোন হালাল ও কল্যানকর কিছু চাওয়া যাবে।
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সালাতে এই ৭টি স্থানে নিজে দুয়া করেছেন এবং সাহাবীদেরকেও দুয়া করতে বলেছেন।
মূলঃ আল্লামাহ আল-হাফিজ, ইমাম ইবনুল কাইয়্যিম আল-জাওজিয়া রাহিমাহুল্লাহ।
বইয়ের নামঃ “আল্লাহর রাসুল কিভাবে নামায পড়তেন”।
শতাব্দী প্রকাশনী, ঢাকার কাঁটাবনে এই বইটা কিনতে পাওয়া যায়, সম্ভব হলে এই বইটা কিনে পড়ার চেষ্টা করবেন ইন শা’ আল্লাহ।

জানাযার নামায পড়তে জানেন?


প্রশ্নঃ আপনি কি জানাযার নামায পড়তে জানেন?
আপনি কি জানাজার নামাযে সুরা ফাতেহা পড়েন?
উত্তরঃ
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে উত্তর হচ্ছে, না।
আপনি কেনো সুরা ফাতেহা পড়েন না, যেখানে রাসুলুল্লাহ(সাঃ) বলেছেন সুরা ফাতেহা ছাড়া কোনো নামায হয়না(চাই সেটা ফরয/ওয়াজিব?সুন্নত/নফল/জানাযা/ঈদেরনামায হোকনা কেনো)।
আপনি কার কথা শুনে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর আদেশঅমান্য করছেন ও তাঁর সুন্নতের বিরোধীতা করছেন?
আপনি জীবনে কুরআনের তর্জমা পড়েছেন? রাসুলুল্লাহ(সাঃ) এর সহীহ হাদীস গুলো পড়েছেন? আপনি কিজীবনে বুখারী শরীফ খুলে দেখেছন?
আপনি যদি কুরআন হাদীসের তর্জমা না পড়েন, তাহলেআপনি কি করে জানবেন কোনটা সঠিক আর কোনটাভুল?
যাই হোক, এবার পোস্টের আলোচনার বিষয়, জানাজারনামায সংক্ষেপে বর্ণনা করা হলোঃ
১. প্রথমে নিয়ত করে “আল্লাহু আকবার” বলে দুই হাতকান বা কাঁধ পর্যন্ত তুলে ইশারা করা ইমামের সাথেনামায পড়া শুরু করবেন। মুখে নাওয়াইতু...পড়ে নিয়তকরা বেদাত। বরং অন্তরে বা মনে মনে নিয়ত করেনেবেন, “নারী/পুরুষ/শিশুর জন্য জানাযার নামায পড়ছেন”, মনে মনে এতটুকু ধারণা থাকলেই নিয়ত করাহয়ে যাবে।
২. আউযুবিল্লাহ, বিসমিল্লাহ পড়ে সুরা ফাতিহা পড়বেন(বুখারী)। দলীল জানতে বুখারীর হাদীস স্ক্যান করাছবিতে দেখুন। সুরা ফাতিহা পড়া ওয়াজিব কিন্তুআমাদের দেশের মানুষ পড়েনা, এটা ভুল। সুরা ফাতিহানা পড়ে সানা পড়ে, জানাজার নামাযে সানা পড়তে হবে– এটা ঠিক না। বরং সুরা ফাতিহা পড়তে হবে।
৩. সুরা ফাতিহা পড়ে যদি সময় থাকে অন্য আরেকটাসুরা পড়বেন। অন্য আরেকটি সুরা পড়া সুন্নত, নাপড়লেও নামায হয়ে যাবে। যদি সময় না থাকে তাহলেইমামের সাথে পরবর্তী তাকবীর দিবেন।
৪. এর পরে “আল্লাহু আকবার” বলে তাকবীর দিবেন। এসময় ১ম তাকবীরের মতো দুই হাত কান বা কাঁধ পর্যন্ততুলে ইশারা করা সুন্নত। কেউ যদি না করেন, তবুও তারনামায হয়ে যাবে।
৫. এর পরে দুরুদে ইব্রাহীম পড়বেন (বুখারী ও মুসলিমঃকিতাকবুল জানায়েজ)
৬. এর পরে “আল্লাহু আকবার” বলে তাকবীর দিবেন। এসময় ১ম তাকবীরের মতো দুই হাত কান বা কাঁধ পর্যন্ততুলে ইশারা করা সুন্নত। কেউ যদি না করেন, তবুও তারনামায হয়ে যাবে।
৭. এর পরে জানাযার দুয়া পড়বেন, আল্লাহুম্মাগফিরলীহায়্যিনা ওয়া মাইয়্যিতিনা...এটা বা অন্য আরো দুয়াআছে সহীহ হাদীসে, যেকোন একটা বা একাধিকা দুয়াপড়তে পারেন।
৮. এর পরে “আল্লাহু আকবার” বলে তাকবীর দিবেন। এসময় ১ম তাকবীরের মতো দুই হাত কান বা কাঁধ পর্যন্ততুলে ইশারা করা সুন্নত। কেউ যদি না করেন, তবুও তারনামায হয়ে যাবে।
৯. এর পরে অন্য আরো দুয়া জানা থাকলে পড়বেন,জানা না থাকলে বা ইমাম সালাম ফিরালে ইমামের সাথেনামায শেষ করবেন।
১০. উল্লেখ্য, সহীহ হাদীসে শুধু মাত্র ডানদিকে একবারঅথবা, ডানে ও বামে দুই দিকে সালাম ফিরানোর কথাএসেছে। মক্কা ও মদীনাতে সহীহ হাদীস মেনে মাঝে মাঝেশুধু ডান দিকে একবার সালাম ফিরিয়ে জানাযার নামাযশেষ করা হয়, এটা করাও সুন্নত। তাই, আমাদের দেশেপ্রচলিত না থাকলেও কখনোও কোথাও এইভাবে নামাযপড়তে দেখলে চমকে যাবেন না।
বিস্তারিত জানতে এই লেকচারটা দেখুন –



আর যে হাদীসগুলো থেকে দলীল নেওয়া হয়েছে,
বুখারীঃ ১৩২২, ১৩৩৫, মুসলিমঃ ৯৬৩, ৯৬৪,তিরমিযীঃ ১০২৬, আবু দাউদঃ ৩১৯৮, ইবনু মাজাহঃ

Sunday, February 22, 2015

মুনাজাতের জন্য জরুরী আরবী দুয়া সমূহ

মুনাজাতের জন্য জরুরী আরবী দুয়া সমূহ

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্‌র জন্য। আল্লাহ দরূদ ও সালাম পেশ করুন আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর; আর তাঁর বংশধর, তাঁর সাহাবীগণ এবং কিয়ামত পর্যন্ত যারা সুন্দরভাবে তাঁদের অনুসরণ করবে তাদের উপর (আমিন)।
দুয়া মানেই যে ওযু করে নামায পড়ে দুই হাত তুলে চাইতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। হ্যা, দুই হাত তুলে দুয়া করা ভালো। তবে আপনি যেকোনো সময় ওঠতে বসতে, কোথাও যেতে যেতে দুয়া করতে পারেন। এইভাবে দুয়া ও যিকিরের মাধ্যমে আমাদের অবসর সময়গুলো কাজে লাগানোর চেষ্টা করা উচিত। আল্লাহ আমাদের তোওফিক দান করুন, আমিন।
নিচের এই দুয়াগুলো হাত তুলে বা হাত না তুলে, যেকোন মুনাজাতে, ফরয, সুন্নত বা নফল যেকোন নামাযের যেকোন সিজদাতে, নামাযের শেষ অংশে অর্থাৎ আত্তাহিয়্যাতু ও দুরুদ পড়ার পরে সালাম ফেরানোর আগে দুয়া মাসুরা হিসেবে, যেকোনো সময়েই পড়া যাবে। দুয়াগুলো ফরয নামাযের ভেতরে আরবীতে পড়তে হবে, আরবীতে না পারলে নফল-সুন্নত নামাযের সিজদাতে, সালাম ফেরানোর পূর্বে বা নামাযের বাইরে আরবী বা বাংলা, যেকোন ভাষাতেই দুয়াগুলো পড়া যাবে।
দিনে রাতে যে কোনো সময় আমল করার জন্য ‘হিসনুল মুসলিম’ বইয়ের সবগুলো দুয়াই সহীহ, আর দাম মাত্র ৫০ টাকা। ছোট্ট এই বইটা পকেটে রেখে দেওয়া যায়, রাস্তায়, জার্নিতে, বাস স্ট্যান্ডে অপেক্ষায় বা যে কোনো অবসব সময়ে বের করে দুয়াগুলো শিখে বা পড়ে সময়টা নষ্ট না করে কাজে লাগানোর জন্য।
বিঃদ্রঃ যারা অলসতা বশত বা ইমানের দুর্বলতার কারণে আরবী মুখস্থ করতে চান না বা পারেন না, তারা অন্তত বাংলাটা মুখস্থ করে রাখতে পারেন এবং মুনাজাতের সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শেখানো গুরুত্বপূর্ণ এই জিনিসগুলো আল্লাহর কাছে চাইতে পারেন।
১. সবচাইতে কম কথায় সবচাইতে বেশি কল্যান প্রার্থনা করার দুয়াঃ
এই দুয়াটা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব বেশি বেশি করতেন।
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অধিকাংশ দো‘আ হতঃ
رَبَّنَا اٰتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَّفِي الْاٰخِرَةِ حَسَـنَةً وَّقِنَا عَذَابَ النَّارِ
উচ্চারণঃ রব্বানা আ-তিনা ফিদ্দুনিয়া হা’সানাতাওঁ-ওয়াফিল আ-খিরাতি হা’সানাতাওঁ ওয়া-ক্বিনা আ’যাবান্নার।
অর্থঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে দুনিয়ার জীবনে কল্যাণ দান করো এবং পরকালের জীবনেও কল্যাণ দান করো। আর তুমি আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে বাঁচাও। সুরা আল-বাক্বারাহঃ ২০১।
কেউ যদি অন্য কোন দুয়া না জানেন আর যেকোন কল্যানের জন্য দুয়া করতে চান, অন্তরে সেই জিনিস পাওয়ার জন্য নিয়ত রেখে এই দুয়া পড়লেও হবে।
২. পাপ থেকে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য দুয়াঃ
আমাদের আদি পিতা আদম (আঃ) ও মা হা’ওয়্যা (আঃ) আল্লাহর নিষেধ অমান্য করলে ক্ষমা প্রার্থনা ও তোওবা করার জন্য স্বয়ং আল্লাহ তাআ’লা তাদের দুইজনকে এই দুয়াটি শিখিয়ে দিয়েছিলেন। এই দুয়ার মাধ্যমে ক্ষমা প্রার্থনা করলে আল্লাহ তাআ’লা তাদেরকে ক্ষমা করে দেন। আমাদের উচিত তাদের মতো আমাদের পাপ থেকে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য নিয়মিত এই দুয়া বেশি করা।
رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
উচ্চারণঃ রাব্বানা যোয়ালামনা আং-ফুসানা ওয়া-ইল্লাম তাগ-ফিরলানা, ওয়াতার্ হা’মনা লানা কুনান্না মিনাল খাসিরিন।
অর্থঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি যুলুম করেছি, অতএব আপনি যদি আমদেরকে ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি দয়া না করেন তাহলে নিশ্চয়ই আমরা ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভুক্ত হব। সুরা আল-আ’রাফঃ ২৩।
৩. পিতা-মাতার জন্য দুয়াঃ
জীবিত বা মৃত পিতা মাতা দুইজনের জন্য এই দুয়া বেশি করতে হবেঃ
رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
উচ্চারণঃ রাব্বির হা’ম-হুমা কামা রাব্বা ইয়ানি সাগিরা।
অর্থঃ হে আমাদের পালনর্তা! আপনি আমার পিতা-মাতার প্রতি তেমনি দয়া করুন যেইরকম দয়া তারা আমাকে শিশু অবস্থায় করেছিল।
মৃত মানুষ জীবিত মানুষের দুয়া দ্বারা উপকৃত হয়, তাই পিতা-মাতার জন্য এই দুয়া করে তাদের উপকার করা সম্ভব। সেইজন্য দুয়া কবুলের সময়গুলোতে যেমন সিজদার সময় এই দুয়া বেশি পড়া উচিত।

৪. ছোট্ট কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা দুয়াঃ
আল্লাহ যখন কারো ভালো করতে চান তখন তাকে অনেক টাকা পয়সা, ভালো স্বামী বা স্ত্রী, দামী গাড়ি দেননা। যদিও আমরা এইগুলোকেই কল্যানের বিষয় বলে মনে করি। পার্থিব সুখ স্বাচ্ছন্দ কখনো আল্লার নেয়ামত হতে পারে, কখনোবা সেটা আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন পরীক্ষাও হতে পারে। কিন্তু আল্লাহ যখন কারো কল্যান করতে চান, তখন তাকে “ফিকহ” বা দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করেন। আর সেই জ্ঞান চাওয়ার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এর শেখানো সুন্দর ছোট্ট একটা দুয়া আছে, আপনারা মুখস্থ করে নিতে পারেন।
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْماً نافِعاً، وَرِزْقاً طَيِّباً، وَعَمَلاً مُتَقَبَّلاً
উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মা ইন্নী আস-আলুকা ই’লমান নাফিআ’ন, ওয়া রিযক্বান ত্বাইয়্যিবান, ওয়া আ’মালাম মুতাক্বাববালান।
অর্থঃ হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট উপকারী জ্ঞান, পবিত্র জীবিকা ও গ্রহণযোগ্য আমল প্রার্থনা করছি। ইবনে মাজাহ, হিসনুল মুসলিম পৃষ্ঠা ১১৩।
এই দুয়াটা আমার প্রিয় কারণ, এর সাথে আরো দুইটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চাওয়া হয়েছে – রিযকান ত্বাইয়্যিবান বা পবিত্র জীবিকা – এর দ্বারা দুনিয়াবি চাহিদার পূরণের জন্যও দুয়া করা হলো আর, আ’মালান মুতাক্বাব্বালান বা – এমন আমল যা আল্লাহর কাছে কবুল হয়, পরকালের জন্য যা প্রয়োজন তাও প্রার্থনা করা হলো। এতো গুরুত্বপূর্ণ তিনটা বিষয় একসাথে ছোট্ট একটা দুয়ার মধ্যে থাকায় আমাদের সবার শিখে নেওয়া উচিত। এই দুয়া প্রত্যেকদিন ফযরের ফরয নামাযের সালাম ফেরানোর পর একবার পড়া সুন্নত। এছাড়া সিজদাতে, সালাম ফিরানোর আগেসহ যেকোনো সময় করা যাবে। আরবীতে না পারলে বাংলাতেও করা যাবে, যতদিন না মুখস্থ হচ্ছে। দুয়াটা পাওয়া যাবে হিসনুল মুসলিম বইয়ের ১১৩ নাম্বার পৃষ্ঠায়।
৫. দুই সিজদার মাঝখানে বসা অবস্থায় দুয়াঃ
এখানে নিজের পছন্দমতো যেকোনো দুয়া করা যায়না, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেই দুয়াগুলো করেছেন শুধুমাত্র সেই দুয়াগুলোই করা যাবে। আর এইখানে দুয়া আরবীতেই করতে হবে। দুই সিজদার মাঝখানে এই দুয়াগুলো করার সময় তাশাহুদের মতো আংগুন দিয়ে ইশারা করা সুন্নত। যেই দুয়া করতে হবেঃ
ছোট্ট এই দুয়াটা কি মুখস্থ করা যায়না? রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফরয, সুন্নত, নফল যে কোনো সালাতের দুই সিজদার মাঝখানে বসা অবস্থায় এই দুআটি করতেনঃ
رَبِّ اغْفِرْ لِي، رَبِّ اغْفِرْ لِي
উচ্চারণঃ রাব্বিগ ফিরলি, রাব্বিগ ফিরলি। অর্থঃ হে আমার রব আমাকে ক্ষমা করা, হে আমার রব আমাকে ক্ষমা কর। আবু দাউদ ১/৩১, ইবনে মাজাহ, দুয়াটা সহীহ।
এই ছোট্ট দুয়াটা পড়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ মিস করা ঠিকনা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দিনে ৭০ থেকে ১০০ বার তোওবা করতেন। আপনি যদি সালাতের দুই সিজদার মাঝখানে এই দুয়াটা পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলেন তাহলে দিনে যত রাকাত করে সালাত পড়বেন, তত বারই আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া হবে। আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার একটা উপায় হচ্ছে বেশি বেশি করে নিয়মিত তোওবা ও ইস্তিগফার করা (ক্ষমা চাওয়ার দুয়া করা)। এছাড়া দুই সিজদার মাঝখানে আরেকটা ছোট্ট সুন্দর দুয়াঃ
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي، وَارْحَمْنِي، وَاهْدِنِي، وَاجْبُرْنِي، وَعَافِنِي، وَارْزُقْنِي، وَارْفَعْنِي
উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মাগফিরলী, ওয়ারহা’মনী, ওয়াহদিনী, ওয়াজবুরনী, ওয়াআ’ফিনি, ওয়ারযুক্বনী, ওয়ারফা‘নী।
অর্থঃ হে আল্লাহ! আপনি আমাকে ক্ষমা করুন, আমার প্রতি দয়া করুন, আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন, আমার সমস্ত ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করে দিন, আমাকে নিরাপত্তা দান করুন, আমাকে রিযিক দান করুন এবং আমার মর্যাদা বৃদ্ধি করুন”।
হাদীসটি ইমাম নাসাঈ ব্যতীত সুনান গ্রন্থগারগণ সবাই সংকলন করেছেন। আবূ দাউদঃ ৮৫০, তিরমিযীঃ ২৮৪, ২৮৫, ইবন মাজাহঃ ৮৯৮। শায়খ আলবানির মতে হাদীস সহীহ।
বিঃদ্রঃ এই দুয়াটা কম-বেশি বিভিন্ন ভাবে বর্ণনা আছে, সবগুলো সহীহ – তবে এখানে যেটা দেওয়া আছে এটা সবচাইতে বড় যেখানে সবগুলো দুয়া একসাথে আছে। এটা করলে সবগুলো দুয়াই করা হলো।
৬. যারা অবিবাহিত তারা নেককার স্বামী/স্ত্রী ও সন্তান পাওয়ার জন্য বা যারা বিবাহিত তাদের স্বামী/স্ত্রী ও সন্তান ধার্মিক হওয়ার জন্য দুয়াঃ
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
উচ্চারণঃ রব্বানা হাবলানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা ক্বুররাতা আ’ইয়ুন, ওয়াজআ’লনা মুত্তাক্বীনা ইমামা।
অর্থঃ হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সন্তানের পক্ষ থেকে আমাদের জন্যে চোখের শীতলতা দান কর এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্যে আদর্শস্বরূপ কর। সুরা আল-ফুরক্বানঃ ৭৪।
৭. আল্লাহর যিকর, শুকিরিয়া ও সুন্দরভাবে তাঁর ইবাদত করার জন্য সাহায্য চাওয়ার দুয়াঃ
اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ، وَشُكْرِكَ، وَحُسْنِ عِبادَتِكَ
উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মা আ ই’ন্নী আ’লা যিকরিকা ওয়া শুকরিকা ওয়া হু’সনি ইবাদাতিকা।
অর্থঃ হে আল্লাহ! তুমি আমাকে তোমার স্মরণ, তোমার কৃতজ্ঞতা এবং তোমার সুন্দর ইবাদত করার ব্যাপারে আমাকে সাহায্য কর”।
এই দুয়া ইচ্ছা করলে নামাযের ভেতরে সিজদাতে বা সালাম ফেরানোর আগে দুয়া মাসুরার সময়ও করা যায়। এই দুয়াটা এতো গুরুত্বপূর্ণ যে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এক সাহাবীকে এই দুয়া পড়ার জন্য বিশেষভাবে ওয়াসীয়ত করে যান। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) মুয়ায বিন জাবাল (রাঃ) এর হাত ধরে বলেছিলেনঃ ‘‘হে মুয়াজ! আল্লাহর কসম আমি তোমাকে ভালোবাসি। অতঃপর তিনি বললেন, হে মুয়াজ! আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি যে তুমি প্রত্যেক সালাতের পর এই দুয়া করা ত্যাগ করবেনা, “আল্লাহুম্মা আ ই’ন্নী আ’লা যিকরিকা ওয়া শুকরিকা ওয়া হু’সনি ইবাদাতিকা।” আবু দাউদ ১/২১৩, নাসায়ী, ইবেন হিব্বান, হাদীস সহীহ।
৮. ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় যেকোনো শিরক থেকে বাঁচার দুয়াঃ
কেউ ৪০ বছর আল্লাহর ইবাদত করলো, কত যে নফল সুন্নত নামায পড়লো, রোযা রাখলো, কিন্তু মরণের আগে শিরক করে তোওবা না করেই মারা গেলো. . .একটা মাত্র শিরক তার সমস্ত আমল নষ্ট করে দেবে (নাউযুবিল্লাহ)!
কেয়ামতের দিন তার আমলগুলোর কোনো ওযন আল্লাহ তাকে দেবেন না, এইগুলোকে ধূলো বালিতে রূপান্তরিত করে দেবেন। আর জেনে হোক বা না জেনেই হোক যেকেউ, যেকোনো সময় শিরকে লিপ্ত হতে পারে, যে যত বড় নেককারই হোক না কেনো (মা যা' আল্লাহ)।
এইজন্য শিরক করা অথবা অনিচ্ছায় শিরকে লিপ্ত হওয়া থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হয়। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) শেখানো একটা দুয়া আছে, কেউ যদি প্রতিদিন সকাল বিকাল একবার করে পড়েন, তাহলে আশা করা যায় আল্লাহ তাকে শিরক থেকে হেফাজত করবেন। আপনি কি জানেন, সেই দুয়াটা কি? দুয়াটা হচ্ছেঃ
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ وَأَنَا أَعْلَمُ، وَأَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لاَ أَعْلَمُ
উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মা ইন্নী আ’উযুবিকা আন উশরিকা বিকা ওয়া আনা আ’লাম, ওয়া আস-তাগফিরুকা লিমা লা আ’লাম।
অনুবাদঃ হে আল্লাহ! আমার জানা অবস্থায় তোমার সাথে শিরক করা থেকে তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আর আমার অজানা অবস্থায় কোনো শিরক হয়ে গেলে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
আহমাদ ৪/৪০৩, হাদীসটি সহীহ, সহীহ আল-জামে ৩/২৩৩। হিসনুল মুসলিমঃ পৃষ্ঠা ২৪৬।
৯. বিপদ বা দুঃশ্চিন্তার জন্য এই দুয়াটা সবাই মুখস্থ করে নিনঃ
তিমি মাছের পেটে থাকা অবস্থায় ইউনুস (আঃ) এই দোয়া করেছিলেন এবং কঠিন বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছিলেন।
لاَ إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظّالِمِينَ
উচ্চারণঃ লা ইলা-হা ইল্লা-আনতা, সুবহা’-নাকা ইন্নি কুনতু মিনায-যোয়ালিমিন।
অর্থঃ (হে আল্লাহ) তুমি ছাড়া আর কোনো মা’বুদ নাই, তুমি পবিত্র ও মহান! নিশ্চয় আমি জালেমদের অন্তর্ভুক্ত।
কুরানুল কারীমে এই দুয়া বর্ণিত হয়েছে সুরা আল-আম্বিয়া: আয়াত নাম্বার ৮৭ তে।
এই দুয়ার উপকারীতাঃ রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “কোনো মুসলিম যদি এই দুয়া পড়ে, তার দুয়া কবুল করা হবে। অন্য হাদীস অনুযায়ী, এই দুয়া পড়লে আল্লাহ তার দুঃশ্চিন্তা দূর করে দিবেন।” সুনানে আত-তিরমিযী।
দুয়া কিভাবে পড়তে হবেঃ বিপদ আপদ বা দুঃশ্চিন্তার সময় এই দুয়া বেশি বেশি করে পড়তে হয়। যতবার ইচ্ছা ও যতবার সম্ভব হয় ততবার পড়বেন। এক লক্ষ পঁচিশ হাজার পড়ে যে “খতম ইউনুস” পড়ানো হয় হুজুর বা মাদ্রাসা ছাত্রদেরকে টাকা দিয়ে ভাড়া করে, বা দুয়া কেনাবেচা করা হয় – এইগুলো বেদাত – এই রকম খতম করানোর কোনো দলীল নেই শরীয়তে। আপনার যতবার সম্ভব হয় ততবার পড়বেন – এত এত বার পড়তে হবে, এমন কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। আপনি নিজের জন্য নিজে দুয়া করবেন - আল্লাহর কাছে সেটাই বেশি পছন্দনীয়। সর্বোত্তম হচ্ছে – ফরয/নফল/সুন্নত যেকোনো নামাযের সিজদাতে এই দুয়া পড়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া। আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর অতুলনীয় রহমতের ছায়ার মধ্যে আশ্রয় দিন, আমীন।
১০. হেদায়েতের উপর থাকা, অন্তর যেন দ্বীনের উপরে থাকে তার জন্য দুয়াঃ
আরবীতে হৃদয়কে বলা হয় ‘ক্বালব’, যার একটা অর্থ হচ্ছে - যেই জিনিস খুব দ্রুত পরিবর্তন হয়ে যায়। অর্থাৎ, মানুষের হৃদয় খুব দ্রুত পরিবর্তন হয়ে যায়, একারণে মানুষ আজকে যাকে ভালোবাসে, কাল তাকে ঘৃণা করে। কেয়ামতের আগে এমন হবে মানুষ সকালে ঈমানদার থাকবে, সন্ধ্যা সময় কাফের হয়ে যাবে। আবার মানুষ সন্ধ্যা সময় ঈমানদার থাকবে, সকালে কাফের হয়ে যাবে। এইজন্য হৃদয় যাতে পরিবর্তন না হয়ে যায়, পাপাচার, কুফুরী, আল্লাহর নাফরমানির দিকে ঝুকে না পড়ে সেই জন্য আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেশি বেশি করে এই দুয়া করতেনঃ

উচ্চারণঃ ইয়া মুক্বাল্লিবাল ক্বুলুব! সাব্বিত ক্বালবী আ’লা দ্বীনিক।
অর্থঃ হে হৃদয় সমূহের পরিবর্তন করার মালিক! আমার হৃদয়কে তোমার দ্বীনের উপর অবিচলভাবে প্রতিষ্ঠিত রাখো। সুনানে তিরমিযী।
১১. জান্নাত প্রার্থনা করা ও জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাওয়ার দুয়াঃ
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْجَنَّةَ وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ النَّارِ
উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মা ইন্নী আসআলুকাল জান্নাতা ওয়া আ’উযু বিকা মিনান্নার।
অর্থঃ হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে জান্নাত চাই এবং জাহান্নাম থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই।
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে ৩ বার জান্নাত প্রার্থনা করে, জান্নাত আল্লাহর কাছে দুয়া করে, হে আল্লাহ তাকে জান্নাত দান করো। যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে ৩ বার জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে, জাহান্নাম আল্লাহর কাছে দুয়া করে, হে আল্লাহ তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দাও”।
তিরমিযিঃ ২৫৭২, ইবনে মাজাহ ৪৩৪০, শায়খ আলবানি এই হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, সহীহুল জামি ৬২৭৫।
উল্লেখ্য, সকাল সন্ধ্যায় ৭ বার “আল্লাহুম্মা আজিরনি মিনান্নার” পড়ার হাদীসটা জয়ীফ বা দুর্বল, শায়খ আলবানী সিলসিলা জয়ীফাহঃ ১৬২৪।
সুতরাং সেটা না পড়ে এই দুয়া পড়বেন, কারণ এটাতে জান্নাত চাওয়া ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি চাওয়া দুইটা দোয়া আছে আর এটা সহীহ। ঐটা থেকে এইদুয়াটা ভালো ও সহীহ।
১২. কেয়ামতের দিন হিসাব সহজ করার জন্য দুয়াঃ
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, প্রত্যেকের হিসাব নেওয়া হবে আর আল্লাহ যার হিসাব নেবেন তাকে শাস্তি দেবেন। এই কথা শুনে সাহাবীরা ভয় পেলো, কারণ কে এমন আছে যে নিষ্পাপ? সুতরাং সকলেই শাস্তি পাবে। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, মুমিনদের জন্য হিসাব সহজ করা হবে। কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাঁর ঈমানদার বান্দাদেরকে রহমতের চাদরে ঢেকে নেবেন, অন্যদের থেকে আলাদা করে দেবেন। এরপরে গোপনে তাকে তার পাপকাজগুলো দেখানো হবে। বান্দা তার পাপকাজগুলো দেখে ভয় পেয়ে যাবে, আর চিন্তা করতে থাকবে তাহলেতো আমার বাঁচার কোনো পথ নাই! তখন আল্লাহ তাকে বলবেন তুমি পাপ করেছো কিন্তু অমুক সময় তোওবা করেছো আর আমি তোমার তোওবা কবুল করেছি। আর শুধু কবুলই করিনাই – তোওবা করেছো এইজন্য পাপ কাজগুলোকে এখন নেকীতে পরিবর্তন করে দিলাম। এইকথা শুনে বান্দা খুব খুশি হয়ে বলবে, হে আল্লাহ আমারতো আরো অনেক পাপ আছে – সেইগুলোতো দেখতে পাচ্ছিনা (পাপের পরিবর্তে নেকী পাওয়ার আশায় সে এই কথা বলবে)।
এর পরে বান্দাকে তার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে। এই হচ্ছে হিসাব সহজ করার পদ্ধতি। এরকম যেন হিসাব গ্রহণ সহজ করা হয়, এই জন্য এই দুয়া করতে হয়ঃ

উচ্চারণঃ আল্লাহুম্ম হা’সিবনি হি’সাবাই-য়্যাসিরা। অর্থঃ হে আল্লাহ তুমি আমার হিসাব সহজ করো।
ইমাম হাকিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, শায়খ আলবানীর মতে দুয়াটি হাসান সহীহ।
১৩. গুনাহ মাফ করার ও নেককার ঈমানদার হিসেবে মৃত্যুর জন্য দুয়াঃ
رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّئَاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ
উচ্চারণঃ রাব্বানা ফাগফির লানা যুনুবানা ওয়া-কাফফির আ’ন্না সাইয়্যিআ-তিনা ওয়া তাওয়াফ্ফানা মাআ’ল আবরা-র।
অর্থঃ হে আমাদের পালনর্তা! আপনি আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিন, আমাদের মন্দ কাজগুলো দূর করে দিন আর আমাদেরকে নেককার হিসেবে মৃত্যু দান করুন। সুরা আলে ইমরানঃ ১৯৩।
১৪. রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর সুন্দর একটি দুয়াঃ
মুখস্ত করে নিতে পারেন ও মুনাজাতে বেশি বেশি করে আর বিশেষ করে সিজদাতে বা সালাম ফেরানোর পূর্বে এই দুয়া করতে পারেন।
اَللهم إِنِّي أَسْأَلُكَ الهُدَى، وَالتُّقَى، وَالعَفَافَ، وَالغِنَى
আল্লা-হুম্মা ইন্নি আস-আলুকাল হুদা ওয়াত-তুকা ওয়াল আ'ফাফা ওয়াল গি’না।
অর্থ: হে আল্লাহ আমি তোমার কাছে হেদায়েত, তাকওয়া, সুস্থতা ও সম্পদ প্রার্থনা করছি।
মুসলিম ২৭২১, তিরমিযী ৩৪৮৯, ইবনু মাজাহ ৩৮৩২, আহমাদ ৩৬৮৪।
১৫. দুঃখ ও দুশ্চিন্তার সময় পড়ার দো‘আঃ
এই দুয়াটা প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় অন্তত একবার পড়া সুন্নত।
يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ بِرَحْمَتِكَ أَسْتَغيثُ أَصْلِحْ لِي شَأْنِيَ كُلَّهُ وَلاَ تَكِلْنِي إِلَى نَفْسِي طَرْفَةَ عَيْنٍ
উচ্চারণঃ ইয়া হা’ইয়্যু ইয়া ক্বাইয়্যূম বিরহ্মাতিকা আস্তাগীস, আসলিহ্-লী শা’নী কুল্লাহু, ওয়ালা তাকিলনী ইলা নাফসী ত্বারফাতা আ’ইন।
অর্থঃ হে চিরঞ্জীব, হে চিরস্থায়ী! তোমরা রহমতের জন্য তোমার দরবারে জানাই আমার সকাতর নিবেদন, তোমার রহমতের অসীলায় তোমার কাছে (বিপদ, দুশ্চিন্তা থেকে) উদ্ধার কামনা করি। তুমি আমার অবস্থা সংশোধন করে দাও, আর তুমি চোখের পলক পরিমান সময়ের (এক মুহূর্তের) জন্যেও আমাকে আমার নিজের উপর ছেড়ে দিওনা।
হাকেম ১/৫৪৫, তিনি হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, আর যাহাবী তা সমর্থন করেছেন, সহীহ আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব ১/২৭৩।
১৬. দুঃখ ও দুশ্চিন্তার, দারিদ্রতা ও ঋণগ্রস্থ হওয়া থেকে মুক্তির জন্য দুয়াঃ
যারা স্বচ্ছল অবস্থায় শান্তিতে আছেন, তারা যেনো কঠিন পেরেশানি, বড় বিপদ, বড় ঋণের বোঝা, মানুষের, অলসতা, অক্ষমতা, কাপুরুষতার স্বীকার না হন, সেই জন্য নিয়মিত এই দুয়া পড়া উচিৎ। আর যারা এইগুলোর স্বীকার হয়েছেন তারাও নিয়মিত এই দুয়া পড়ে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইবেন।
اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ
উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মা ইন্নি আ‘ঊযু বিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হা’যানি, ওয়াল আ’জযি ওয়াল কাসালি, ওয়াল বুখলি ওয়াল জুবনি, ওয়া দ্বোলাই’দ-দ্বাইনি ওয়া গালাবাতির রিজা-ল।
অর্থঃ হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি আপনার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি দুঃশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে, অলসতা ও অক্ষমতা থেকে, কৃপণতা ও কাপুরুষতা থেকে, ঋণের বোঝা ও মানুষের নির্যাতন-নিপীড়ন থেকে। [বুখারীঃ ২৮৯৩]
রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এ দুআ’টি বেশি বেশি করে পড়তেন। ফাতহুল বুখারীঃ ১১/১৭৩।
১৭. দুনিয়া ও আখেরাতের যাবতীয় কল্যানের জন্য সুন্দর একটি দুয়াঃ
আমরা সবাই দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত। আপনি লক্ষ্য করে দেখবেন আমাদের বেশিরভাগ দুয়াই ঘুরেফিরে দুনিয়া কেন্দ্রিক। দুনিয়াবি কোনকিছু চাওয়া নিষেধ বা অপছন্দের কিছু না, বরং দুনিয়া আখেরাতের ছোট-বড় প্রতিটা বিষয়ের জন্যই আল্লাহর কাছে দুয়া করলে আল্লাহ খুশি হন। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, আল্লাহ যেই ঈমানদারদের প্রশংসা করেছেন, তারা শুধু দুনিয়ার জন্যই দুয়া করতোনা, তাদের দুয়া হচ্ছেঃ “রাব্বানা আ-তিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাও-ওয়াফিল আ-খিরাতি হাসানাতাও ওয়া-ক্বিনা আযাবান্নার” অর্থাৎ, হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদেরকে দুনিয়ার জীবনে কল্যাণ দাও এবং পরকালে জীবনেও কল্যাণ দান করো। আর আমাদেরকে জাহান্নামের আযাব থেকে বাঁচাও। (সুরা বাক্বারাহ)। অর্থাৎ, তারা দুনিয়ার জন্য দুয়া করতো কিন্তু সাথে সাথে পরকালের কল্যানের জন্যও দুয়া করতো। তবে পরকালের জন্য দুনিয়াবী কল্যানের চাইতে দুই গুণ বেশি দুয়া করে, কারণ দুনিয়ার জীবন পরকালের তুলনায় অতি নগণ্য। যাই হোক, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সুন্দর এই দুয়াটা মুখস্থ করে আপনারা সহজেই নামাযে বা নামাযের বাইরে দুনিয়া ও আখেরাতের উভয় জাহানের কল্যানের জন্য দুয়া করতে পারবেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই দুয়া করতেন,


উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মা আসলিহ-লি দ্বিনিয়াল্লাযি হুয়া ই’সমাতু আমরি, ওয়া আসলিহ’-লি দুনিয়া-য়্যাল্লাতি ফীহা মাআ’-শী, ওয়া আসলিহ’-লি আ-খিরাতায়াল্লাতী ফীহা মাআ’দী। ওয়াজ আ’লিল হায়া-তা যিয়া-দাতাললী ফি কুল্লি খাইরি ওয়াজ আ’লিল মাউতা রা-হা’তাল লী মিং কুল্লি শাররি।
অর্থঃ হে আল্লাহ্! তুমি আমার দ্বীনকে আমার জন্য সঠিক করে দাও, যা আমার সকল বিষয়ের প্রতিরক্ষা। তুমি আমার দুনিয়াকে আমার জন্য সংশোধন করে দাও, যার মধ্যে রয়েছে আমার জীবন-জীবিকা। তুমি আমার আখেরাতকে আমার জন্য সুন্দর করে দাও, যেখানে আমাকে ফিরে যেতে হবে। তুমি আমার প্রত্যেক পুণ্য কাজে আমার জীবনকে বৃদ্ধি করে দাও এবং প্রত্যেক মন্দ কাজ হতে মৃত্যুকে আমার জন্য শান্তির কারণে পরিণত কর।
রিয়াদুস সালেহীনঃ ১৪৭২, সহীহ মুসলিমঃ ২৭২০।