Tuesday, May 5, 2015

মৃত-ব্যক্তির প্রতি সাওয়াব প্রেরণের মাসনূন পদ্ধতি

মৃত-ব্যক্তির প্রতি সাওয়াব প্রেরণের মাসনূন পদ্ধতি

মৃত্যু পরবর্তী জীবনের সফলতা, মুক্তি, শান্তি ও নেয়ামত লাভের ইচ্ছা ও চেষ্টা সকল ধর্মের অনুসারিগণই করেন। এই জাতীয় সকল কর্ম একান্তই ধর্মীয় ও বিশ্বাসভিত্তিক। বিভিন্ন জাতির মধ্যে ধর্মহীনতা ও অজ্ঞানতার প্রসারের ফলে এ বিষয়ে অনেক কুসংস্কার ও উদ্ভট ধারণা বিরাজমান। যেমন, অনেক সমাজে মনে করা হয়, মৃতের জীবিত আত্মীয়স্বজনের দান, খাদ্য প্রদান বা কিছু অনুষ্ঠান পালনের উপরে মৃতব্যক্তির পারলৌকিক মুক্তি নির্ভরশীল।

ইসলামে এ সকল কুসংস্কারের মূলোৎপাটন করা হয়েছে। ইসলামের শিক্ষা অনুসারে মানুষের পারলৌকিক মুক্তি, শান্তি ও সফলতা নির্ভর করে তার নিজের কর্মের উপরে। সৎকর্মশীল মানুষের মৃত্যুর পরে বিশ্বের কোথাও কিছু না করা হলে, এমনকি তাঁর দেহের সৎকার করা না হলেও তাঁর কিছুই আসে যায় না। অপরদিকে জীবদ্দশায় যিনি শির্ক, কুফর, ইসলাম বিরোধিতা, ইসলামের বিধিনিষেধের ও ইসলামী কর্ম ও আচরণের প্রতি অবজ্ঞা, জুলুম, অত্যাচার, অবৈধ উপার্জন, ফাঁকি, ধোঁকা ইত্যাদিতে লিপ্ত থেকেছেন তার জন্য তার মৃত্যুর পরে বিশ্বের সকল মানুষ একযোগে সকল প্রকার ‘শ্রাদ্ধ’, অনুষ্ঠান, ‘প্রার্থনা’ ইত্যাদি করলেও তার কোনো লাভ হবে না।

তবে যদি কোনো ব্যক্তি বিশুদ্ধ ঈমানসহ ইসলামের ছায়াতলে থেকে সৎকর্ম করে মৃত্যুবরণ করেন, তাহলে জীবিত ব্যক্তিগণ তাঁর জন্য প্রার্থনা করলে প্রার্থনার কারণে দয়াময় আল্লাহ তাঁর সাধারণ অপরাধ ক্ষমা করতে পারেন বা তাকে সাওয়াব ও করুনা দান করতে পারেন। এছাড়া এই ধরনের মানুষের কল্যাণের উদ্দেশ্যে কোনো জীবিত মানুষ দান বা জনকল্যাণমূলক কর্ম করলে সেই কর্মের সাওয়াব করুনাময় আল্লাহ উক্ত মৃতব্যক্তিকে প্রদান করতে পারেন। এই ধরনের কর্মকে সাধারণত আরবিতে ‘‘ঈসালে সাওয়াব’’ ও ফারসিতে ‘‘সাওয়াব রেসানী’’ বলা হয় যার অর্থ: সাওয়াব পৌঁছানো।

তাহলে আমরা দেখছি যে, মানুষের মুক্তি নির্ভর করে মূলত নিজের কর্মের উপর। তবে বিশুদ্ধ ঈমানদার সৎ মানুষদের জন্য দু‘আও দান করা যায়। কুরআন কারীমে মৃত ব্যক্তির জন্য দু‘আ করার নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। হাদীস শরীফে মৃত ব্যক্তির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা, দু‘আ ও দান-সদকা করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাঁদের উদ্দেশ্যে জীবিত ব্যক্তির এ সকল কর্মের সাওয়াব তাঁরা লাভ করবেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া মৃতের দায়িত্বে হজ্জপালন বাকি থাকলে তা তাঁর পক্ষ থেকে পালন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

 এগুলি সাধারণ নির্দেশনা ও ফযীলতমূলক হাদীস। এখন আমাদের দেখতে হবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবায়ে কেরাম এই ফযীলতের কর্মটি কী-ভাবে পালন করেছেন। অর্থাৎ এই কর্মটির ক্ষেত্রে ‘সুন্নাত’ কী তা জানতে হবে।

এখানে উল্লেখ্য যে, দু‘আ বা দান-সদকার জন্য কোনো প্রকার সমাবেশ, অনুষ্ঠান বা দিন তারিখের কোনো প্রকারের ফযীলত বা গুরুত্ব আছে - সে কথা কোনো হাদীসে কখনো বলা হয় নি। এছাড়া কুরআন খতম, কালেমা খতম ইত্যাদি ইবাদত পালন করে মৃত ব্যক্তিদের জন্য সাওয়াব দান করলে তাঁরা এ সকল ইবাদতের সাওয়াব পাবেন বলে কোনো হাদীসে কোনো প্রকারে বলা হয় নি।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীদের যুগে কারো ইন্তেকালের পরে তার জন্য দু‘আ করার উদ্দেশ্যে পরবর্তী সময়ে কখনো কোনোভাবে তাঁরা জমায়েত হন নি। কারো মৃত্যু হলে নিকটাত্মীয়গণের জন্য তিন দিন শোক প্রকাশের বিধান রয়েছে ইসলামে। এই তিন দিনে সমাজের মানুষেরা মৃতের আত্মীয়গণকে সমবেদনা জানাতে ও শোক প্রকাশ করতে তাঁদের বাড়িতে আসতেন। এছাড়া মৃত ব্যক্তির জানাযার নামাযের ও দাফনের পরে আর কখনো তাঁকে কেন্দ্র করে ৩ দিনে, ৭ দিনে, ৪০ দিনে বা মৃত্যুদিনে বা অন্য কোনো সময়ে মাসিক, বাৎসরিক বা কোনোভাবে তাঁর কবরের কাছে, অথবা বাড়িতে বা অনুষ্ঠানকারীর বাড়িতে বা অন্য কোথাও কোনোভাবে তাঁরা কোনো অনুষ্ঠান করেননি বা কোনো জমায়েতও করেন নি।

মৃত ওলী, প্রিয়জন বা বুজুর্গের জন্য দু‘আ ও ঈসালে সাওয়াবের ক্ষেত্রে তাঁদের সুন্নাত ছিল ব্যক্তিগতভাবে দু‘আ করা এবং সুযোগ সুবিধা ও আগ্রহ অনুযায়ী ব্যক্তিগতভাবে তাঁদের জন্য দান-সাদকা ও হজ্ব ওমরা বা কুরবানি করা। সুযোগমত কোন প্রকারের আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া তাঁদের কবর যিয়ারত করে তাঁদেরকে সালাম দেওয়া ও তাঁদের জন্য দু‘আ করা।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর মৃত্যুর পরে প্রায় একশত বৎসরের মধ্যে খুলাফায়ে রাশেদীন ও সাহাবীগণ একটিবারও তাঁর কুলখানী, ইসালে সাওয়াব, ওরস ইত্যাদি উপলক্ষ্যে তাঁর ওফাত দিনে বা অন্য কোনো দিনে, কোনো রকম দিন নির্ধারণ করে বা না-করে, মদীনায় বা অন্য কোথাও কখনোই কোনো অনুষ্ঠান, সমাবেশ, মাহফিল, খানাপিনা কিছুই করেন নি।

মৃত বুজুর্গ বা প্রিয়জনদের জন্য দু‘আ করার ও সাওয়াব প্রেরণের আগ্রহ ও প্রয়োজনীয়তা তাঁদের ছিল। এ বিষয়ের হাদীসগুলি তাঁরা জানতেন। এজন্য জমায়েত হওয়া, বিভিন্ন দিনে, নিয়মিত বা অনিয়মিত মৃতের কবরে, বাড়িতে বা অন্য কোথাও কোনো অনুষ্ঠান করা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল। কিন্তু কখনই তাঁরা তা করেন নি। তাঁরা সকল প্রকারের জমায়েত, আনুষ্ঠানিকতা বর্জন করেছেন। কোনো প্রকারের দিন তারিখ মাস বার পালন-করা বর্জন করেছেন। সকল প্রকারের কুলখানী, ওরস, জমায়েত বা অনুষ্ঠান তাঁরা বর্জন করেছেন। তাঁরা ব্যক্তিগত ও অনানুষ্ঠানিক দু‘আ ও দানকেই এ সকল ক্ষেত্রে একমাত্র পদ্ধতি বলে মনে করেছেন।

প্রকৃতপক্ষে মৃত বুজুর্গ বা প্রিয়জনের জন্য সদা সর্বদা সুযোগ ও আবেগ অনুসারে দু‘আ করাই ছিল তাঁদের স্থায়ী ও নিয়মিত সুন্নাত। এছাড়া কোনো কিছুই তাঁরা নিয়মিত করেন নি। কারো পিতামাতা বা কোনো আপনজন মারা গেলে হয়ত মৃত্যুর পরেই তাঁদের জন্য কিছু দান করেছেন, জমি ওয়াকফ করেছেন বা অনুরূপ জনকল্যাণমূলক কোনো কাজ করেছেন। কেউ বা তাঁদের হজ্ব বাকি থাকলে হজ্ব আদায় করে দিয়েছেন। ঈসালে সাওয়াব বা মৃতের জন্য সাওয়াব প্রেরণের জন্য সর্বদা দু‘আ করাই ছিল তাঁদের নিয়মিত সুন্নাত। এ ক্ষেত্রে নিম্নের হাদীসসমূহ প্রনিধানযোগ্য।

প্রথমত: ব্যক্তির মৃত্যুর পরও যে সব আমলের সাওয়াব সে অব্যাহতভাবে পেতে থাকে এবং  জীবিতরাও মৃতের জন্য এ সকল কাজের আঞ্জাম দিতে পারে এ সম্পর্কে হাদীসে এসেছে –
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ «إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَنْهُ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثَةٍ إِلَّا مِنْ صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ»
‘‘আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন যে, মানুষ যখন মারা যায় তখন তিনটি আমল ব্যতীত তার সকল আমলই বন্ধ হয়ে যায়। 
১. সাদাকায়ে জারিয়া, 
২. মানুষ উপকৃত হয় এমন ‘ইলম এবং 
৩. নেক সন্তান, যে তার জন্য দু‘আ করে।’’[1]
অপর এক হাদীসে এসেছে –
عَنْ أَبِي أُمَامَةَ الْبَاهِلِيِّ عَنْ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ «أَرْبَعَةٌ تَجْرِي عَلَيْهِمْ أُجُورُهُمْ بَعْدَ الْمَوْتِ مُرَابِطٌ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَمَنْ عَمِلَ عَمَلًا أُجْرِيَ لَهُ مِثْلُ مَا عَمِلَ وَرَجُلٌ تَصَدَّقَ بِصَدَقَةٍ فَأَجْرُهَا لَهُ مَا جَرَتْ وَرَجُلٌ تَرَكَ وَلَدًا صَالِحًا فَهُوَ يَدْعُو لَهُ»
‘‘আবু উমামাহ আল বাহিলী রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন যে, চারটি বিষয়ের সাওয়াব প্রাপ্তি মানুষের মৃত্যর পরও অব্যাহত থাকে। 
১. আল্লাহর রাস্তায় সীমান্ত প্রহরী, 
২. ব্যক্তির এমন (মাসনূন) আমল যা অন্যেরাও অনুসরণ করে, 
৩. এমন সাদাকাহ যা সে স্থায়ীভাবে জারী করে দিয়েছে, 
৪. এমন নেক সন্তান রেখে যাওয়া যে তার জন্য দু‘আ করে।’’[2]

দ্বিতীয়ত: সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম তাঁদের মৃত পিতা-মাতার প্রতি সাওয়াব প্রেরণের জন্য কী ব্যবস্থা প্রহণ করতেন নিম্নের হাদীসসমূহ থেকে আমরা আরো স্পষ্ট নির্দেশনা পেতে পারি:
 عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ أَنَّ رَجُلًا قَالَ لِلنَّبِيِّ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ «إِنَّ أَبِي مَاتَ وَتَرَكَ مَالًا وَلَمْ يُوصِ فَهَلْ يُكَفِّرُ عَنْهُ أَنْ أَتَصَدَّقَ عَنْهُ قَالَ نَعَمْ»
 ‘‘আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিকট জানতে চাইলেন যে, আমার পিতা কিছু সম্পদ রেখে মারা গেছেন কিন্তু তিনি কোনো ওসীয়ত করে যান নি। আমি কি তাঁর জন্য কিছু সাদাকাহ করতে পারি; যাতে তাঁর গুনাহের কাফফারা হতে পারে ? তিনি বললেন, হ্যা পার।’’[3]
অপর এক হাদীসে এসেছে :
 عَنْ سَعْدِ ابْنِ عُبَادَةَ قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ أُمِّي مَاتَتْ أَفَأَتَصَدَّقُ عَنْهَا قَالَ «نَعَمْ قُلْتُ فَأَيُّ الصَّدَقَةِ أَفْضَلُ قَالَ سَقْيُ الْمَاءِ»
‘‘সা‘দ ইবন ‘উবাদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার আম্মা মারা গেছেন। আমি কি তাঁর জন্য কিছু সাদাকাহ করতে পারি? তিনি বললেন, হ্যাঁ পার। আমি বললাম, কোন সাদাকাহ উত্তম? তিনি বলরেন, পানি পান করানো (অর্থাৎ কূপ খনন করে দেয়া)।’’[4]
অপর এক হাদীসে এসেছে :
» أَنَّ سَعْدَ بْنَ عُبَادَةَ رَضِي اللَّه عَنْه تُوُفِّيَتْ أُمُّهُ وَهُوَ غَائِبٌ عَنْهَا فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ أُمِّي تُوُفِّيَتْ وَأَنَا غَائِبٌ عَنْهَا أَيَنْفَعُهَا شَيْءٌ إِنْ تَصَدَّقْتُ بِهِ عَنْهَا قَالَ نَعَمْ قَالَ فَإِنِّي أُشْهِدُكَ أَنَّ حَائِطِيَ الْمِخْرَافَ صَدَقَةٌ عَلَيْهَا»
‘‘সা‘দ ইবন ‘উবাদাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু এর মা তার অনুপস্থিতিতে মারা যান। পরে তিনি বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আমার অনুপস্থিতিতে আম্মা মারা গেছেন। আমি যদি তাঁর জন্য কিছু সাদাকাহ করি তবে কি তা তাঁর উপকারে আসবে ? তিনি বললেন, হ্যা। তিনি বললেন, আপনি সাক্ষী, আমার মিখরাফ নামক বাগানটি তাঁর জন্য সাদাকাহ করলাম।’’[5]

তৃতীয়ত: মৃত্যুর পরও পিতা-মাতার প্রতি সন্তানের কিছু দায়িত্বের কথা নিম্নের হাদীসগুলো থেকে জানতে পারি :
 عَنْ عَائِشَةَ رَضِي اللَّه عَنْهَا أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ «مَنْ مَاتَ وَعَلَيْهِ صِيَامٌ صَامَ عَنْهُ وَلِيُّهُ»
‘‘আয়িশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি রোজা আদায় না করে মারা গেল, তার পক্ষ থেকে তার ওলী (দায়িত্বশীল) সে রোজা আদায় করবে।’’[6]
অপর এক হাদীসে এসেছে :
 عَنْ أَبِي أُسَيْدٍ مَالِكِ بْنِ رَبِيعَةَ قَالَ بَيْنَمَا نَحْنُ عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذْ جَاءَهُ رَجُلٌ مِنْ بَنِي سَلَمَةَ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَبَقِيَ مِنْ بِرِّ أَبَوَيَّ شَيْءٌ أَبَرُّهُمَا بِهِ مِنْ بَعْدِ مَوْتِهِمَا قَالَ «نَعَمِ الصَّلَاةُ عَلَيْهِمَا وَالِاسْتِغْفَارُ لَهُمَا وَإِيفَاءٌ بِعُهُودِهِمَا مِنْ بَعْدِ مَوْتِهِمَا وَإِكْرَامُ صَدِيقِهِمَا وَصِلَةُ الرَّحِمِ الَّتِي لَا تُوصَلُ إِلَّا بِهِمَا»
‘‘আবু উসায়দ মালিক ইবন রবী‘আহ রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে ছিলাম, এমতাবস্থায় বনী সালামার এক ব্যক্তি এসে বলল, ইয়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার পিতা-মাতার মৃত্যুর পর এমন কোন সদাচরণ কি বাকী আছে যা আমি তাঁদের সাথে করতে পারি ? তিনি বললেন, হ্যা, তাঁদের জন্য দু‘আ ও ক্ষমা প্রার্থনা করা, তাঁদের মৃত্যুর পর তাঁদের কৃত প্রতিশ্রুতিগুলো পূর্ণ করা, তাঁদের বন্ধু-বান্ধবদের সম্মান করা এবং সে আত্মীয়গুলো রক্ষা করা, যেগুলো শুধু তাঁদের বন্ধনের কারনেই রক্ষা করা হয়ে থাকে।’’[7]
অপর এক হাদীসে এসেছে :
عَنِ الْحَجَّاجِ ْبنِ دِيْنَارٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى الله ُعَلَيْهِ وَسَلَّمَ «أَنَّ مِنَ الْبِرِّ بَعْدَ الْبِرِّ أَنْ تُصَلِّي عَلَيْهِمَا مَعَ صَلاَتِكَ وَأَنْ تَصُوْمَ عَنْهُمَا مَعَ صِيَامِكَ  وَأَنْ تُصَدِّقَ عَنْهُمَا مَعَ صَدَقَتِكَ
‘‘হাজ্জাজ ইবন দীনার হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, (পিতা-মাতার প্রতি জীবিতাবস্থায়) সদাচরণের পর (মৃত্যু পরবর্তী) সদাচরণ হলো - তোমার নামাযের সাথে তাদের পক্ষ থেকেও নামায পড়া, রোজার সাথে তাদের পক্ষ থেকেও রোজা রাখা এবং তোমার সাদাকার সাথে তাদের জন্যও কিছু সাদাকাহ করা।’’[8]
অপর এক হাদীসে এসেছে :
عَنْ عَطَاءَ قَالَ «يُقْضَى عَنِ الْمَيِّتِ َأْرَبعٌ َالْعِتَقُ وَالصَّدَقَةُ وَالْحَجُّ وَالْعُمْرَةُ» .
‘‘আতা (রহ.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন যে, মৃতের পক্ষ হতে চারটি কাজ করণীয়: গোলাম আযাদ করা, সাদাকাহ করা, হজ্জ করা এবং ওমরা করা।’’[9]
এছাড়াও সাদাকার পুরস্কার সম্পর্কে এক হাদীসে এসেছে :
«ظِلُّ الْمُؤْمِنِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ صَدَقَتُهُ»
‘‘সাদাকাহ কিয়ামতের দিন মু‘মিনের ছায়া হবে।’’[10]

        উপরোক্ত হাদীসসমূহের সারসংক্ষেপ যা দাড়ায় তা হলো :
১. মৃত্যুর পরও মৃত ব্যক্তি পাঁচটি কাজের সাওয়াব পেতে থাকে। কাজগুলো হলো : সাদাকায়ে জারিয়া করে যাওয়া, উপকারী ইলম রেখে যাওয়া, এমন নেক সন্তান রেখে যাওয়া যে তার জন্য দু‘আ করবে, জীবিত থাকাকালে আল্লাহর রাস্তায় সীমান্ত পাহারা দেয়া এবং মৃত ব্যক্তির এমন (মাসনূন) আমল যা পরবর্তীতে অন্যরা অনুসরণ করে।
২. সাহাবায়ে কেরাম তাঁদের পিতা-মাতার মৃত্যুর পর তাঁদের জন্য সাদাকায়ে জারিয়ার ব্যবস্থা করতেন। যেমন- ফসলের বাগান ওয়াকফ করতেন, পানির কূপ খনন করে দিতেন ইত্যাদি।
৩. তাঁদের রোজা বাকী থাকলে তাঁদের পক্ষ হতে তাঁরা তা আদায় করতেন।
৪. তাঁরা তাঁদের জন্য দু‘আ ও ক্ষমা প্রার্থনা করতেন, তাঁদের কৃত প্রতিশ্রুতিগুলো পূর্ণ করতেন, তাঁদের বন্ধু-বান্ধবদের সম্মান করতেন এবং সে আত্মীয়গুলোও রক্ষা করতেন, যেগুলো তাঁদের বন্ধনের কারণে সৃষ্টি হয়েছে।
৫. তাঁরা তাঁদের পক্ষ হতে গোলাম আযাদ করতেন, হজ্জ করা বাকী থাকলে হজ্জ এবং ওমরা করতেন। এ ছাড়াও তাঁরা তাঁদের জন্য নফল নামায এবং নফল রোজাও করতেন বলে জানা যায়।

এখন আমাদের সমাজে মৃতব্যক্তিদের জন্য দু‘আর উদ্দেশ্যে অথবা তাদের জন্য দান-সদকার সময়ে বিভিন্ন পদ্ধতিতে আমরা জমায়েত হই ও অনুষ্ঠান করি। এ সকল অনুষ্ঠান নিঃসন্দেহে খেলাফে-সুন্নাত বা সুন্নাত বিরোধী। অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে যে, কেউ যদি পূর্ণ সুন্নাত অনুযায়ী অনানুষ্ঠানিকভাবে দান-সাদকা ও দু‘আ করেন তাহলে অনেক মুসলিম তাঁর কর্মকে খুবই অপছন্দ করবেন। এভাবে তাঁরা ‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর সুন্নাতকে’ অপছন্দ করছেন।

• আমাদের সমাজের মুসলিমগণ কিভাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাত অপছন্দ ও অবহেলা করেন তার কিছু নমুনা এখানে আলোচনা করছি :

(১). দু‘আকে অবহেলা করা ও আনুষ্ঠানিকতাকে উত্তম মনে করা :
আমরা দেখলাম যে, মৃত বুজর্গ বা আপনজনের জন্য ব্যক্তিগতভাবে সর্বদা দু‘আ করাই ছিল তাঁদের একমাত্র নিয়মিত সুন্নাত। অপরদিকে আমরা অনেক সময় ‘‘দু‘আ’’ করাকে তত গুরুত্ব প্রদান করি না। চিন্তা করি দু‘আতে আর কি হবে, নিজে কিছু নেক কাজ করে সেই কাজের সাওয়াব তাঁদেরকে প্রদান করতে হবে। চিন্তাটি সঠিক নয়। মৃত মুসলিমের জন্য অন্য মুসলিমের দু‘আই সবচেয়ে বড় দান। দু‘আর বিনিময়ে আল্লাহ তাঁদেরকে অফুরন্ত সাওয়াব ও রহমত প্রদান করেন। মৃতদের জন্য কুরআনে অনেক দু‘আ উল্লেখিত হয়েছে।

এক্ষেত্রে দু‘আর জন্য তাঁরা কখনো কোনো প্রকার অনুষ্ঠান করেন নি। আমরা অনুষ্ঠানহীন ব্যক্তিগত দু‘আর কোনো গুরুত্ব আছে বলে মনে করি না। অন্তত ব্যক্তিগত দু‘আর চেয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু আলেম ও বুজুর্গকে ডেকে মৃতের জন্য দু‘আ করাকে উত্তম মনে করি। অথচ সাহাবীগণকে দেখুন। সাইয়্যেদুল মুরসালীন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁদের মধ্যে রয়েছেন। অথচ ২৩ বৎসরের নবুয়তী জিন্দেগিতে একদিন একজন সাহাবীও এসে বললেন না, হুজুর আমার পিতামাতা বা কোনো বুজুর্গের জন্য দু‘আর মাজলিস করেছি, আপনি যেয়ে একটু দু‘আ করে দেবেন। অথবা মসজিদে নববীতেই আজ নামাযের পরে সবাইকে নিয়ে আপনি একটু দু‘আ করে দেবেন। এরূপ একটি ঘটনাও দেখতে পাবেন না। অনুরূপভাবে পরবর্তী প্রায় ২ শত বৎসরে সাহাবী, তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীগণের যুগেও এই ধরনের কোনো ঘটনা দেখা যায় না।

(২) কুরআন খতম, কালেমা খতম ইত্যাদিকে গুরুত্ব প্রদান ও উত্তম ভাবা :
কুরআন খতম, কালেমা খতম ইত্যাদিকে আমরা দান ও দু‘আর চেয়ে বেশি গুরুত্ব প্রদান করি। অপরদিকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  ও তাঁর সাহাবীগণ কখনো মৃতের জন্য কুরআন খতম, কালেমা খতম ইত্যাদি অনুষ্ঠান করেন নি। এগুলির সাওয়াব মৃতব্যক্তি পাবেন বলে কোনো হাদীসে বলা হয় নি। তবে, অনেক আলেম বলেছেন যে, যেহেতু দান, দু‘আ, হজ্ব ইত্যাদির সাওয়াব মৃতব্যক্তি পাবেন বলে হাদীসে বলা হয়েছে, সেহেতু আমরা আশা করতে পারি যে, কুরআন তিলাওয়াত, যিকর, তাসবীহ ইত্যাদি ইবাদতের সাওয়াবও তাঁরা পাবেন।

এখানে উল্লেখ্য যে, কুরআন কারীম পূর্ণ পাঠ করা বা খতম করা একটি মাসনূন ইবাদত হলেও ‘‘কালেমা খতম’’ কোনো মাসনূন ইবাদত নয়। ‘‘কালেমা খতম’’, ‘‘দু‘আ ইউনূস খতম’’, ‘‘খতমে খাজেগান’’ ইত্যাদি সবই বানোয়াট ‘‘খতম’’। কালেমা বা ‘‘লাইলাহা ইল্লল্লাহ’’ একটি মাসনূন যিকর এবং শ্রেষ্ঠ যিকর। এই যিকর যতবার করা হবে তত বেশি সাওয়াব পাওয়া যাবে।[11] এক লক্ষ বা সোয়া লক্ষ বার পাঠ করলে বিশেষ কোনো সাওয়াব আছে বলে মনে করা খেলাফে-সুন্নাত।

অন্য অনেক আলেম বলেছেন যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  দান, দু‘আ ইত্যাদির কথা বললেন, অথচ কুরআন খতম বা যিকর-তাসবীহ ইত্যাদির সাওয়াব মৃত ব্যক্তির কাছে পৌঁছাবে বলে জানান নি বা উম্মতকে এগুলি পালন করে মৃতদের জন্য সাওয়াব রেসানী করতে শেখান নি। এখন আন্দাজে এরূপ আশা করলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শিক্ষাকে অপূর্ণ বলে দাবি করা হবে।

সর্বাবস্থায়, আমরা বুঝতে পারছি যে, আমরা যদি মৃত বুজুর্গ বা আপনজনের জন্য দান করি বা দু‘আ করি তাহলে তাঁরা তার সাওয়াব পাবেন বলে নিশ্চিত; কারণ স্বয়ং রাসূলুল্লাহ  সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে তা বলেছেন। আর কুরআন খতম, কালেমা খতম ইত্যাদির সাওয়াব পাবেন বলে বড়জোর আশা করা যায়।

যে সকল আলেম কুরআন খতম বা তাসবীহ-তাহলীলের সাওয়াব মৃত ব্যক্তি পেতে পারেন বলে আশা করেছেন তাঁরা বলেছেন যে, যদি কেউ শরীয়ত-সম্মতভাবে ইখলাসের সাথে এগুলি পাঠ করে তাহলেই সাওয়াবের আশা করা যায়। আর সে যদি নিজেই এমনভাবে পাঠ করে যাতে তারই কোনো সাওয়াব হবে না, তাহলে সে আর কী পাঠাবে! এজন্য কোনো মুসলিম যদি তাঁর মৃত পিতামাতা, স্বজন বা উস্তাদ-বুজুর্গের জন্য মনের ইখলাস ও আবেগ নিয়ে কুরআন পাঠ করে তিলাওয়াতের সাওয়াব তাঁদেরকে প্রদানের নিয়্যাত করে, তাহলে হয়ত তাঁরা পেতেও পারেন। কিন্তু কেউ যদি টাকার বিনিময়ে, খাদ্যের আশায় বা লোক দেখানোভাবে এসকল ইবাদত করে, তাহলে তার তো কোনো সাওয়াবই হবে না, উপরন্তু সে গোনাহগার হবে। এক্ষেত্রে সাওয়াব পাঠানোর চিন্তা বাতুলতা।

এখন আমাদের সমাজের মুসলিমগণের অবস্থা চিন্তা করুন। সকলেই দান ও দু‘আর চেয়ে এ সকল খতমকে গুরুত্ব বেশি দিচ্ছেন। প্রয়োজনে অনেক টাকাপয়সা খরচ করে এ সকল খতমের আয়োজন করছেন। কিন্তু তিনি খতম ছাড়া নিঃশর্তভাবে এই টাকাগুলি হাফেজ বা খতম পাঠকারীদেরকে দিতে রাজি নন। তিনি সকল দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

কেউ যদি মৃতের ‘‘ঈসালে সাওয়াব’’ বা সাওয়াব প্রেরণের উদ্দেশ্যে কোনো হাফেজ, আলেম, এতিম, বিধবা, দরিদ্র বা অন্য কাউকে হাদিয়া, সাহায্য বা দান হিসাবে কিছু টাকা দেন, তাহলে হয়ত তা দান হিসাবে আল্লাহর কাছে গৃহীত হতে পারে ও মৃত ব্যক্তি সাওয়াব পেতে পারেন। কিন্তু তিনি এদেরকে দিয়ে ‘‘খতমের কাজ’’ আদায় করে এদেরকে পারিশ্রমিক দান করেন। এ ভাবে তিনি: 
প্রথমত, একটি খেলাফে-সুন্নাত কাজ করছেন। 
দ্বিতীয়ত, দু‘আ ও দানের সুন্নাত পরিত্যাগ করে বা অপছন্দ করে গোনাহগার হচ্ছেন। 
তৃতীয়ত, টাকা বা খাদ্যের আশায় যারা খতম পড়ছেন তাঁরা যেহেতু কোনো সাওয়াবই পাচ্ছেন না, সেহেতু মৃতের জন্য কিছু লাভের ক্ষীণতম আশাও নেই। 
চতুর্থত, এভাবে যাদেরকে দিয়ে খতম পড়ালেন তাঁরাও গোনাহগার হলেন। এভাবে সুন্নাত ছেড়ে সকল দিক থেকেই তিনি ক্ষতিগ্রস্থ হলেন। অথচ তিনি যদি এতকিছু না করে নিজে দু‘আ করতেন এবং খরচের টাকাগুলি দান করতেন আর সেটার অসিলায় মৃত ব্যক্তির জন্য দো‘আ করতেন, তাহলে সুন্নাত অনুসারে কর্মের জন্য নিজেও সাওয়াব পেতেন, আর দু‘আ ও দানের সাওয়াব মৃতব্যক্তি পেতেন।

আমাকে অনেকে প্রশ্ন করেছেন, আমরা কুরআন পাঠ করতে পারি না বলে কি পিতামাতাকে কিছু দিতে পারব না? আমি বলেছি, দান করুন তাহলেই তো হলো। কিন্তু তাঁদের তৃপ্তি হয় না। মনে হয় তারা চিন্তা করেন, হাফেজদেরকে দিয়ে কিছু কুরআন না পড়িয়ে শুধু শুধু এতগুলি টাকা তাদেরকে দিয়ে কী হবে?

(৩). দানের ক্ষেত্রে সুন্নাত পদ্ধতির চেয়ে আনুষ্ঠানিকতাকে গুরুত্ব প্রদান :
দানের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  ও সাহাবীগণের সুন্নাত হলো অনানুষ্ঠানিক দান। জমি ওয়াকফ, কূপ খনন ইত্যাদি। কিন্তু আমরা কখনোই এই প্রকার দানে তৃপ্ত হতে পারি না। আপনি যতই বুঝান-না কেন, যত সুন্নাতের কথাই বলুন-না কেন, মনের চিন্তা একটিই - কিছু একটু না-করলে কিভাবে হয়! শ্রা্দ্ধ জাতীয় একটা অনুষ্ঠান করাই দরকার। সমাজের মানুষেরও একই কথা : বাপটা মরে গেল, কিছুই করল না! কিছু অর্থ ‘‘শ্রাদ্ধ’’।

অনেক মানুষকে বুঝিয়েছি, আপনারা খানাপিনা করানোর টাকা দিয়ে পিতামাতার বা বুজুর্গের জন্য একটি মসজিদ, মাদ্রাসা, দাতব্য হাসপাতাল, চিকিৎসা কেন্দ্র বা এতিমখানা তৈরি করুন বা শরীক হোন। খাবার পানি বা সেচের জন্য গভীর বা অগভীর নলকূপ স্থাপন করে জনগণ বা চাষীদের জন্য ওয়াকফ করুন। না হলে টাকাগুলি কোনো দরিদ্র, বিধবা, এতিম, কন্যাদায়গ্রস্থ, অসুস্থ বা অনুরূপ কাউকে দান করুন। এভাবে আপনি সুন্নাতের মধ্যে থাকবেন, আপনি ও আপনার মৃত আপনজন বা ওলী-বুজুর্গ অফুরন্ত সাওয়াব ও রহমত লাভ করবেন।

কেউ বুঝতে চান না। কেউ এসকল খাতে কিছু ব্যয় করলেও ‘‘কিছু একটা’’ না করে পারেন না। অথচ এই ‘‘কিছু’’ বা খানাপিনা শুধু সুন্নাত বিরোধীই নয়, এতে নিয়্যাত, পরিবেশনা, সামাজিকতা ইত্যাদি করাণে সাওয়াবের চেয়ে গোনাহই বেশি হয়। সামাজিক আচার কিভাবে আমাদের মনমগজকে কব্জা করেছে এবং এক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীগণের সুন্নাতকে মেরে ফেলেছে তা চিন্তা করুন।

(৪). এ সকল কাজের জন্য কোনো দিন বা মৃত্যু দিনকে নির্ধারণ করা :
মৃত স্বজন বা বুজুর্গের জন্য দু‘আ ও সাওয়াব প্রেরণ অর্থাৎ ঈসালে সাওয়াব বা সাওয়াব রেসানীর জন্য হিন্দু, খ্রিষ্টান ও অন্যান্য অমুসলিম সম্প্রদায়ের অনুকরণে আরেকটি বিষয় আমাদের মধ্যে প্রবেশ করেছে, তা হলো এসকল কাজের জন্য দিন নির্ধারণ। মৃত্যুর পরে প্রথমত ৩য়, ৭ম, ৪০তম বা এই জাতীয় দিনে অনুষ্ঠান করা। পরে মৃত্যু দিনে অনুষ্ঠান করা।

আগেই বলেছি, নেককার বা বদকার, স্বজন বা বুজুর্গ কারো জানাযা ও দাফনের পরে দু‘আ বা খানাপিনার জন্য কোনো প্রকার অনুষ্ঠান করাই সুন্নাত বিরোধী কাজ। আর এ সকল অনুষ্ঠানের জন্য এভাবে দিন নির্ধারণ অতিরিক্ত একধাপ সুন্নাত বিরোধিতা। কুলখানী, দু‘আর মাহফিল, খতম, ঈসালে সাওয়াব, সাওয়াব রেসানী, ওরস ইত্যাদি যে নামেই তা করা হোক সবই সুন্নাত বিরোধী কর্ম। এগুলি করার অর্থ হলো এ সকল বিষয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও সাহাবীগণের সুন্নাতকে অপছন্দ করা।

(৫). সাইয়েদ আহমদ ব্রেলভী রহ. এর নসীহত :
সমাজের অপ্রতিরোধ্য চাপের কাছে নতি স্বীকার করে উপরের সকল খেলাফে-সুন্নাত কর্মকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, বিভিন্ন ওজরখাহি করে, পূর্বে আলোচিত বিভিন্ন প্রকারে অপ্রাসঙ্গিক আয়াত ও হাদীসকে ‘‘অকাট্য দলিল’’ হিসাবে পেশ করে ‘‘জায়েয’’ বলেছেন কেউ কেউ। তবে কেউ বলেন নি যে, এগুলি সুন্নাত বা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণ কখনো এগুলি করেছেন।

অপরদিকে অনেক আলেম সমাজের কাছে নতি স্বীকার করতে চান নি। তাঁরা চেষ্টা করেছেন যেন আমাদের সমাজ অন্য সকল বিষয়ের মতো এ বিষয়েও অবিকল সুন্নাত অনুযায়ী চলেন। যাতে সুন্নাত জীবিত হয় এবং মুসলিমগণ নিশ্চিতরূপে সাওয়াব ও বরকত লাভ করেন।

এ সকল আলেম ও বুজুর্গগণের একজন সাইয়েদ আহমদ ব্রেলভী (রহ.)। তিনি এ বিষয়ে আলোচনা কালে বলেন: এখন কেউ যদি প্রচলিত রুসূম অনুযায়ী এ সকল ফাতেহা, ইসালে সাওয়াব, কুলখানী, ওরস ইত্যাদি পালন না-করেন তাহলে সুন্নাত বিষয়ে অজ্ঞ মানুষেরা বলবে যে, তিনি আল্লাহর ওলী ও বুজুর্গগণের ভক্তি করেন না, তাঁদের হক্ক আদায় করেন না বা তাঁদের প্রতি আদব রক্ষা করেন না। তার এই চিন্তার মাধ্যমে তিনি বলতে চান যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর আহলে বাইত, সাহাবীগণ, তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ী ও অন্যান্য নেককার বুজুর্গগণ, যাঁরা এ সকল রেওয়াজ সমাজে প্রচলিত হওয়ার আগে চলে গিয়েছেন তাঁরা সবাই তাঁদের পূর্ববর্তী বুজুর্গ ও আউলিয়াগণের প্রতি বেয়াদবী করেছেন। উপরন্তু আমাদের নবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর পূর্বপুরুষ ও আল্লাহর খলীল ইবরাহীম এর প্রতিও একই রকম বেআদবী করেছেন বলে দাবি করা হবে। নাঊযু বিল্লাহ!! নাঊযু বিল্লাহ!!!

এ বিষয়ে তিনি কিছু মূল্যবান নসীহত করেছেন :
প্রথমত, সকল মৃত বুজুর্গ ও আপনজনের ক্ষেত্রেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  ও সাহাবীগণের সুন্নাত হুবহু পালন করা ও প্রতিষ্ঠা করাই সর্বোত্তম। এজন্য কাফন, দাফন, জানাযা ও মাসনূন তিন দিনের শোক প্রকাশের বাইরে কোনো প্রকারের রুসূম না-মানা প্রয়োজন। বিবাহের ওলীমা ছাড়া সকল প্রকার খানাপিনার আয়োজন ও রুসূম রেওয়াজ পরিত্যাগ করতে হবে। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -কেই পেশওয়া, মুরববী ও আদর্শ মানতে হবে। তাঁর আদর্শকে সামনে রেখে পারসিক, রোমীয়, মধ্য এশিয়, ভারতীয় ইত্যাদি সকল রুসূম রেওয়াজ পরিত্যাগ করতে হবে। কারণ এগুলি সবই তাঁর ও তাঁর সাহাবীগণের প্রচলিত রীতি ও তাঁদের তরীকার অতিরিক্ত কর্ম। এগুলি বর্জন করতে হবে এবং এগুলির প্রতি নিজের ঘৃণা ও না-রাজি প্রকাশ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, এ সকল রুসূমাতের মধ্যে নিয়্যাতগত ও কর্মগত অনেক গোনাহের কাজ রয়েছে, যার ফলে কেয়ামতের দিন এ সকল রুসূমাত পালনকারীকে কঠিন বিপদে পড়তে হবে। কেউ যদি একান্তই খালেস নিয়্যাতে, খালেসভাবে কোনোরকম দিনতারিখ স্থান বা পদ্ধতি নির্ধারণ না-করে কিছু খাওয়া দাওয়া করান তাহলে হয়ত তিনি সাওয়াব পাবেন। তবে তাকে মনে রাখতে হবে যে, মৃতকে সাওয়াব পাঠনো খানাপিনা করানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দু‘আ ও দানই মৃতের সাওয়াব পাঠানোর সুন্নাত-সম্মত পদ্ধতি। খানাপিনা করানো দানের একটি প্রকরণ মাত্র। সাহাবীগণ এক্ষেত্রে এই প্রকরণ ব্যবহার করেন নি, বরং কূপ খনন, জমি বা বাগান ওয়াকফ করা ইত্যাদি কাজের মাধ্যমে দানের সাওয়াব প্রেরণ করেছেন। আমাদেরও এ সকল পদ্ধতিতে দান করা উচিত।

তৃতীয়ত, যদি আমরা এ সকল খেলাফে-সুন্নাত ও বিদ‘আত রুসূম রেওয়াজ পরিত্যাগ করতে না-পারি, তাহলে অন্তত সুন্নাতকে পূর্ণাঙ্গ মনে করতে হবে। কেউ যদি অবিকল সুন্নাত পদ্ধতিতে হুবহু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর সাহাবীগণের মতো দু‘আ ও দানে রত থাকেন এবং সকল প্রকার কুলখানী, ইসালে সাওয়াব, ওরশ ইত্যাদি অনুষ্ঠান পরিত্যাগ করেন, তাহলে তাঁকে উত্তম ও পরিপূর্ণ সুন্নাতের অনুসারী বলে মহববত করতে হবে। এভাবে সকল বিষয়ে সুন্নাতকে পরিপূর্ণ ও আমাদের রুসূমকে খেলাফে সুন্নাত ও বিশেষ প্রয়োজনে বা বাধ্য হয়ে করছি বলে মনে করতে হবে।[12]

আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে সকল বিষয়ে সুন্নাত তরীকা অবলম্বনের তাওফীক দান করুন। আমীন !!

সম্পাদকের কথা:
মৃত ব্যক্তির জন্য করণীয় কাজসমূহের দ্বারা তার কাছে কী সাওয়াব পৌঁছে না কি সেটার অসীলা দ্বারা দো‘আ করা হলে সেটা কাজে লাগে এ ব্যাপারে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের ইমামগণের মধ্যে দু’টি মত পাওয়া যায়।
এক. শাইখুল ইসলাম ইবন তাইমিয়্যা, ইবনুল কাইয়েম রহ. সহ একদল আলেম মনে করেন যে তাদের কাছে সাওয়াব পৌ‍ছে। এ ব্যাপারে তারা তাদের গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
দুই. পক্ষান্তরে অধিকাংশ আলেম মনে করেন, সওয়াব কেউ কাউকে দিতে পারে না, বরং উচিত হবে সৎকাজ করে সেটার অসীলা দিয়ে দো‘আ করা। শাইখুল আলবানী রহ. সহ অনেক বিদগ্ধ আলেম এমতটিকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।

এ দ্বিতীয় মতটিকে আমি প্রাধান্য দিয়ে থাকি। কিন্তু আমাদের লেখককে মনে হচ্ছে প্রথম মতের প্রবক্তা। এ ব্যাপারে আমি তার মতামতের উপর হস্তক্ষেপ না করে বিষয়টি বর্ণনা করে দেওয়া যুক্তিযু্ক্ত মনে করেছি।
আহলে সুন্নাত ওয়াল জামা‘আতের মতভেদটি দ্বান্দ্বিক নয় বরং প্রকারান্তিক। কারণ, সবাই মনে করেন যে শরী‘আতে অনুমোদিত নয় এমন কোনো কাজ করলে সেটা বিদ‘আত হবে। যেমন উরস, চল্লিশা (চেহলাম), পঞ্চ দিনের অনুষ্ঠান, কিংবা খতমে তাহলীল, খতমে খাজেগান, নির্দিষ্ট দিনে দো‘আ অনুষ্ঠান, কুলখানি ইত্যাদি সকল বিষয় বিদ‘আত ও পথভ্রষ্টতা। এ ব্যাপারে কারও কোনো দ্বিমত নেই।
আল্লাহ আমাদেরকে সুন্নাতের উপর পরিপূর্ণভাবে আমল করার তৌফিক দিন। আমীন।

Tuesday, April 21, 2015

সিজদাতে দুয়া

প্রশ্নঃ রাসুলুল্লাহ (সাঃ) সিজদাতে বেশি বেশি দুয়া করতে বলেছেন। আমি আরবী জানিনা, আমি কি নামাযের মধ্যে সিজদায় নিজের মাতৃভাষায় (বাংলা/ইংরেজী) দুয়া করতে পারবো?
উত্তরঃ বিষয়টি নিয়ে আলেমদের মধ্যে মত পার্থক্য হয়েছে, তবে যেটা বেশি সঠিক তা হলোঃ হ্যা, কেউ যদি আরবী না জানে তাহলে সে দুনিয়া বা আখেরাতের যেকোনো কল্যানের জন্য সিজদাতে নিজের ভাষায় দুয়া করতে পারবে।
এই ক্ষেত্রে দুটি শর্ত রয়েছে –
১. যে যিকির ও দুয়াগুলো করা ফরয সেগুলো আরবীতেই করতে হবে যেমন “সুবহা’না রাব্বিয়াল আ’লা” –এই যিকির আরবীতেই করতে হবে।
২. যেই দুয়া করবেন সেটা আপনি আরবীতে জানেন না। যেমন কেউ আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইবেন আর তিনি জানেন আস্তাগফিরুল্লাহ (হে আল্লাহ তুমি আমাকে ক্ষমা করো), তাহলে সেই দুয়া তাকে আরবীতেই করতে হবে। কিন্তু তিনি যদি ঋণ থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দুয়া করতে চান কিন্তু তিনি জানেন না আরবীতে এই কথা কিভাবে বলতে হবে, তাহলে তিনি বাংলায় এইভাবে বলতে পারবেন, ‘হে আল্লাহ তুমি আমাকে ঋণ থেকে মুক্ত করো’।
এই ব্যাপারে আল্লাহই সবচেয়ে ভালো জানেন।
প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন শায়খ আসিম আল-হাকিম।
বিঃদ্রঃ সিজদা হলো দুয়া কবুলের সবচেয়ে উত্তম সময়। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “বান্দা যখন সিজদা করে সে তখন তার রব্বের সবচেয়ে নিকটে পৌঁছে যায়। অতএব তোমরা ঐ সময় বেশি বেশি দুয়া করো”
অন্য হাদীসে এসেছে, “তোমরা সিজদাতে দুয়া করতে চেষ্টা করো, আশা করা যায় তোমাদের দুয়া কবুল করা হবে।”
মুসলিম, মিশকাত হা/৮৯৪।
সিজদাতে দুয়া করার নিয়মঃ
অনেকের মনে প্রশ্ন আছে বা বিষয়টা ভুল বুঝেছেন। তাই বিস্তারিত বলা হলো। কারো অন্য প্রশ্ন থাকলে দয়া করে কমেন্টে জানাবেন।
প্রশ্নঃ আমি কোন সিজাদাতে দুয়া করবো, নামাযের মধ্যে সিজদাতে নাকি আলাদা সিজদা করতে হবে দুয়া করার জন্য?
উত্তরঃ যে কোনো নামাযের মধ্যে সিজদাতে দুয়া করা যাবে। দুয়া করার জন্য নামায ব্যতীত শুধু সিজদা করা জায়েজ নয়। শুধুমাত্র তেলাওয়াতের সিজদাহ ও শুকরিয়ার সিজদাহ ছাড়া, নামায ব্যতীত শুধু সিজদাহ করা বৈধ নয়।
প্রশ্নঃ ফরয নামাযে দুয়া করতে পারবো নাকি সুন্নত/নফল নামাযের সিজদাতে দুয়া করতে হবে?
উত্তরঃ যে কোনো নামাযের সিজদাতে দুয়া করা যাবে, চাই সেটা ফরয হোক আর নফল সুন্নত হোক, কারণ, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) আমভাবে সিজদাতে দুয়া করতে বলেছেন, তিনি শুধুমাত্র নফল সুন্নতে করার জন্য আর ফরয নামাযে না করার জন্য – এইরকম ভাগ করে দিয়ে যান নি। তাই, এই কথা বলার কারো অধিকার নাই, ফরয নামাযে করা যাবেনা। যে এইরকম করবে সে কোনো দলীল ছাড়াই শরীয়ত বানানোর দায়ে অভিযুক্ত হবে।
(শায়খ আব্দুল আজীজ বিন বাজ এই ফতোয়ার পক্ষে মত দিয়েছেন)।
প্রশ্নঃ কিভাবে দুয়া করতে হবে?
আপনি স্বাভাবিকভাবে নামায পড়বেন, সিজদাতে যাবেন, সিজদার তাসবীহগুলো যেমন “সুবহা’না রাব্বিইয়াল আ’লা” ৩/৫/৭ বার অবশ্যই আরবীতে পড়বেন। সিজদার তাসবীহ পড়া হলে আপনি দুয়া করবেন। আরবী জানলে আরবীতে, না জানলে নিজের ভাষাতে।
প্রশ্নঃ নামাযে দুনিয়াবী কোনো কল্যান প্রার্থনা করা যাবে?
উত্তরঃ হ্যা, যাবে যদিনা সেটা হারাম কোনো কিছু হয়ে থাকে। আমাদের দেশের অনেক হুজুর বলে নামাযে দুনিয়ার কোনো কিছু চাইলে নামায ভেঙ্গে যাবে, এই কথার কোনো দলীল নেই, কোনো দলীল নেই। এটা একটা মনগড়া ফতোয়া। স্বয়ং রাসুলুল্লাহ (সাঃ) নামাযের মধ্যে দুনিয়ার কল্যান চেয়েছেন, যেমন ২ সিজদার মাঝখানে তিনি বলতেন “হে আল্লাহ তুমি আমাকে রিযক দান করো” – রিযক দুনিয়া না আখেরাতের বিষয় আশা করি সকলেই জানেন।
আর রাসুল (সাঃ) বলেছেন, দুয়া করতে তিনি দুনিয়ার কোনো কিছু চাইতে না করেন নি। সুতরাং এর পরে কারো ক্ষমতা নেই, না করার।
প্রশ্নঃ ফরয নামাযে জামাতে দুয়া করা যাবে?
উত্তরঃ হ্যা যাবে, যদি সিজদার তাসবীহ পড়ার পরে ইমাম সাহবে যথেষ্ঠ সময় দেন তাহলে করা যাবে। আর যদি সময় কম থাকে তাহলে আগে সিজদার তাসবীহ পড়তে হবে

রফউল ইয়াদাইন

রফউল ইয়াদাইন


প্রশ্ন: নামাজ পড়ার সময় রফউল ইয়াদাইন করা হয় এটা কুরআন ও হাদীস সম্মত কিনা। রফউল ইয়াদাইন করলে  সওয়াব আছে কি?
উত্তর: রফউল ইয়াদাইন (রুকুতে যাওয়ার সময় ও রুকু হতে ওঠার সময় হাত উঁচু করা) করা এবং না করা নিয়ে বিভিন্ন মাযহাব পন্থিদের মধ্যে বিস্তর মতভেদ লক্ষ্য করা যায়। যারা রফউল ইয়াদাইনের বিপক্ষে, তারা বলেন: যেন একসময় রফউল ইয়াদাইন রাসূল (সা.) করেছেন, পরে এটি মনসূখ বা রহিত হয়েছে। আর যারা পক্ষে, তাদের দলীল রয়েছে অসংখ্য সহীহ হাদীস।
যারা হানাফী মাযহাবের অনুসারী তারা নামাজে রুকুতে যাওয়ার সময় এবং রুকু থেকে ওঠার সময় রফ’উল ইয়াদাইন করে না। আলিম সমাজ আমাদের মত সাধারণ মুসল্লীদের বলে থাকেন, এটি নাবী মুহাম্মাদ (সাঃ) প্রথম দিকে করেছেন এবং শেষের দিকে বাদ দিয়েছেন অর্থাৎ মানসুখ হয়ে গেছে। সেই বিশ্বাসেই আজ সাধারণ মুসল্লীগণ রফ’উল ইয়াদাইন করেন না। যাহা অন্যান্য মাযহাব এবং আমাদের দেশে আহলে হাদীস বা সালাফীগণ করে থাকেন। মসজিদের হুজুরকে জিজ্ঞেসা করলে বলে, দু’ইটাই সুন্নাত। আসুন
একটু বিস্তারিত আলোচনা করে দেখা যাকঃ
প্রথমেই আমাদের হানাফী মাযহাবের শ্রেষ্ঠ আলিমগণের মতামত দিয়ে শুরু করা যাকঃ
১।  ‘মোল্লা ‘আলী ক্বারী হানাফী (রহঃ) বলেনঃ সালাতে রুকুতে যাওয়ার সময় ও রুকু থেকে উঠার সময় দু’ হাত না তোলা সম্পর্কে যেসব হাদীস বর্ণিত হয়েছে সেগুলো সবই বাতিল হাদীস। তন্মধ্যে একটিও সহীহ নয়। (মাওযু’আতে কাবীর, পৃ-১১০)
২। হানাফী মুহাদ্দিস আল্লামা বদরুদ্দীন আইনী হানাফী (রহঃ) রুকুতে যাওয়ার পূর্বে রফ’উল ইয়াদাইন করার ব্যাপারে ইমাম আবূ হানিফা (রহঃ) সম্পর্কে লিখেছেনঃ ইমাম আবূ হানিফা সূত্রে বর্ণিত হয়েছে যে, তা ত্যাগ করলে গুনাহ হবে। (উমদাতুল ক্বারী, ৫/২৭২)
৩। শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলবী হানাফী (রহঃ) বলেনঃ যে মুসল্লী রফ’উল ইয়াদাইন করে ঐ মুসল্লী আমার কাছে অধিক প্রিয় সেই মুসল্লীর চাইতে যে রফ’উল ইয়াদাইন করে না। কারণ রফ’উল ইয়াদাইন করার হাদীসগুলো সংখ্যায় বেশি এবং অধিকতর মজবুত। (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ ২/১০)
তিনি আরো বলেন, রফ’উল ইয়াদাইন হচ্ছে সম্মান সূচক কর্ম। যা মুসল্লীকে আল্লাহর দিকে রুজু হওয়ার ব্যাপারে এবং সালাতে তন্ময় হওয়ার ব্যাপারে হুঁশিয়ার করে দেয়। (হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ ২/১০)
৪। আল্লামা আবুল হাসান সিন্ধী হানাফী (রহঃ) বলেনঃ যারা এ কথা বলে যে, তাকবীরে তাহরীমাহ ছাড়া রুকুতে যাওয়ার সময় এবং রুকু থেকে উঠার সময় দু’ হাত তোলার হাদীস মানসূখ ও রহিত, তাদের ঐ দাবী দলীলবিহীন এবং ভিত্তিহীন। (শারহু সুনানে ইবনে মাজাহ, মিসরের ছাপা ১ম খণ্ড ১৪৬ পৃষ্ঠার টিকা)
৫। আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশমিরী হানাফী (রহঃ) বলেনঃ এ কথা জানা উচিত যে, সালাতে রফ’উল ইয়াদাইন করার হাদীস সূত্র ও ‘আমালের দিক দিয়ে মুতাওয়াতির, এতে কোনই সন্দেহ নেই। আর এটা মানসূখও নয় এবং এর একটি হরফও নাকচ নয়। (নাইলুল ফারকাদাইন, পৃ- ২২, রসূলে আকরাম কী নামায, পৃ-৬৯)
৬। হানাফী মাযহাবের ফিক্বাহ গ্রন্থাবলীতেও রাফ’উল ইয়াদাইনের পক্ষে বক্তব্য রয়েছে। তন্মধ্যকার কয়েকটি উল্লেখ করা হলঃ
(ক) রুকু’র পূর্বে ও পরে রফ’উল ইয়াদাইন করার হাদীস প্রমাণিত আছে। (আয়নুল হিদায়া ১/৩৮৪, নুরুল হিদায়া)
(খ) রফ’উল ইয়াদাইন করার হাদীস, রফ’উল ইয়াদাইন না করার হাদীসের চাইতে শক্তিশালী ও মজবুত। (আয়নুল হিদায়া ১/৩৮৯)
(গ) বায়হাক্বীর হাদীসে আছে, ইবনু উমার বর্ণনা করেছেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) মৃত্যু পর্যন্ত সালাতের মধ্যে রফ’উল ইয়াদাইন করেছেন। (আয়নুল হিদায়া ১/১৮৬)
(ঘ) রফ’উল ইয়াদাইন না করার হাদীস দুর্বল। (নুরুল হিদায়া, ১০২)
(ঙ) রাসূলুল্লাহ (সাঃ) থেকে রফ’উল ইয়াদাইন প্রমাণিত আছে এবং এটাই হাক্ব। (আয়নুল হিদায়অ ১/৩৮৬)
এবার সহীহ হাদীসের আলোকে রফ’উল ইয়াদাইনের কয়েকটি প্রসিদ্ধ হাদীস বর্ণনা করা হলোঃ
(১) ‘আব্দুল্লাহ ইবনু ‘উমার (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে দেখেছি, তিনি যখন সালাতেস জন্য দাঁড়াতেন তখন কাঁধ পর্যন্ত দু’ হাত উঠাতেন, এবং তিনি যখন রুকুর জন্য তাকবীর বলতেন তখনও এরূপ করতেন, আবার যখন রুকু থেকে মাথা উঠাতেন তখনও এ রকম করতেন এবং সামিআল্লাহুলিমান হামিদাহ বলতেন। তবে তিনি সাজদাহর সময় এমন করতেন না। (সহীহুল বুখারী, ৭৩৪, ৭৩৫, মুসলিম, নাসায়ী, ইবনু মাজাহ, আহমাদ, মুয়াত্তা মালিক, মায়াত্তা মুহাম্মাদ, ত্বাহাভী, বায়হাক্বী, তিরিমিযী)
(২) মালিক ইবনুল হুওয়াইরিস (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন সালাতের জন্য তাকবীর দিতেন তখন কান পর্যন্ত দু’ হাত উঠাতেন। একইভাবে তিনি রুকু’তে যাওয়ার সময় কান পর্যন্ত দু’ হাত উঠাতেন এবং রুকু’ থেকে উঠার সময়ও কান পর্যন্ত হাত উঠাতেন ও সামিআল্লাহুলিমান হামিদাহ বলতেন। (সহীহ মুসলিম হা/৩৯১, সহীহ সুনানে ইবনে মাজাহ, সহীহ আবূ দাউদ, ইরওয়অ ২/৬৭, হাদীসটি সহীহ)
(৩) আলী (রা.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.) কে তাকবীরে তাহরীমাহর সময়, রুকু’র সময়, রুকু’ হতে মাথা উঠানোর সময় এবং দু’ রাক’আত শেষে তৃতীয় রাক’আতে দাঁড়ানোর সময়ে রফ’উল ইয়াদাইন করতে দেখেছেন। (বায়হাক্বী ২/৮০, বুখারীর জুযউল ক্বিরআত, আবূ দাউদ, ইবনে মাজাহ)
(৪) ওয়ায়িল ইবনু হুজর (রাঃ) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ) এর সাথে সালাত আদায় করেছি। তিনি তাকবীর দিয়ে সালাত আরম্ভ করে দু’হাত উঁচু করলেন। অতঃপর রুকু’ করার সময় এবং রুকু’র পরেও দু’হাত উঁচু করলেন। (আহমাদ, বুখারীর জুযউল ক্বিরাআত, ইবনে মাজাহ, আবূ দাউদ)
(৫) মুহাম্মাদ ইবনু ‘আমর বলেন, আমি নাবী (সা.) এর দশজন সাহাবীর মধ্যে আবূ হুমাইদের নিকট উপস্থিত ছিলাম, তাঁদের (আবূ হুমাইদ, আবূ উসাইদ, সাহল ইবনু সা’দ, মুহাম্মাদ ইবনু মাসলামাহ- (রা.) প্রমুখ সাহাবীগণের মধ্যে একজন আবূ ক্বাতাদাহ ইবনু রবয়ী (রা.) ও ছিলেন। তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সালাত সম্পর্কে আপনাদের চাইতে বেশি অবগত। তাঁরা বললেন, তা কিভাবে? আল্লাহর শপথ! আপনি তো আমাদের চেয়ে তাঁর অধিক নিকটবর্তী ও অধিক অনুসরণকারী ছিলেন না। তিনি বললেন, বরং আমি তো তাঁকে পর্যবেক্ষণ করেছিলাম। তাঁরা বললেন, এবার তাহলে উল্লেখ করুন। তিনি বললেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন সালাতে দাঁড়াতেন তখন দু’হাত উঁচু করতেন এবং যখন রুকু’ করতেন, রুকু’ থেকে মাথা উঠাতেন, এবং দু’ রাক’আত শেষে তৃতীয় রাক’আতে দাঁড়াতেন তখনও দু’ হাত উঁচু করতেন। এ বর্ণনা শুনে তাঁরা সবাই বললেন, আপনি সত্যই বলেছেন। (বুখারীর জুযউল ক্বিরাআত, সহীহ ইবনু মাজাহ, সহীহ আবূ দাউদ)
রফ’উল ইয়াদাইন সম্পর্কে বর্ণিত হাদীস ও আসারের সংখ্যা এবং সেসবের মান-
(ক) রফ’উল ইয়াদাইন সম্পর্কে বর্ণিত সর্বমোট সহীহ হাদীস ও আসারের সংখ্যা অন্যূন ৪০০ শত। (সিফরুস সাআদাত, পৃ-১৫)
(খ) ইমাম বুখারী (রহঃ) বলেন, রফ’উল ইয়াদাইনের হাদীসসমূহের সনদের চেয়ে বিশুদ্ধতম সনদ আর নেই। (ফাতহুল বারী ২/২৫৭)
(গ) হাদীসের অন্যতম ইমাম হাফিয তাকীউদ্দিন সুবকী (রহ.) বলেন, সালাতের মধ্যে রফ’উল ইয়াদাইন করার হাদীস এতো বেশি যে, রফ’উল ইয়াদাইনের হাদীসকে মুতাওয়াতির বলা ছাড়া উপায় নেই। (সুবকীর জুযউ রফ’উল ইয়াদাইন)
রফ’উল ইয়াদাইনের হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীগণের সংখ্যা-
রুকু’তে যাওয়া ও রুকু’ হতে উঠার সময় রফ’উল ইয়াদাইন করা সম্পর্কে চার খলীফাসহ প্রায় ২৫ জন সাহাবী  থেকে বর্ণিত হাদীসসমূহ রয়েছে। (সালাতুর রসূল (সা.), পৃষ্ঠা ৬৫, হাদীস ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ প্রকাশিত)
সুতরাং নির্দিধায় বলা যায় যে, রফউল ইয়াদাইন করাটাই উত্তম। এবং এই আমল করাতে সাওয়াব বেশি রয়েছে।

দৈনন্দিন তসবীহ্ ও দোয়া সমুহ

দৈনন্দিন তসবীহ্ ও দোয়া সমুহ

ফজরের জন্য ঘুম থেকে উঠার পরঃ
আল-হামদুলি্ল্লাহিল্লাযী আহ্‌ইয়ানা বা’দামা আমাতানা ওয়া ইলাইহিন নুশুর। (বুখারী, মুসলিম)।
অর্থ: সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য যিনি আমাকে (নিদ্রারুপ) মৃত্যুর পর পুর্নজাগরিত করলনে, এবং তিনি আমাদেরকে (এইরূপেই কিয়ামতের দিন) তাঁর নিকট একত্রিত করবেন।
লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াহিদা্হু লা-শারীকালাহু, লাহুল মুলক্ ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শা্য়্যিন ক্বাদীর। ছুবাহানাল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহি ওয়া লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়া আল্লাহু আকবার ওয়া লা হাওলা ওয়া লা ইলাহা ইল্লা বিল্লাহিল আলীয়্যিল আযীম। আল্লাহুম্মাগফিরলী।
ফযীলতঃ যে ব্যক্তি অজুসহ রাতে ঘুমায়, অতপর রাতে জেগে উঠেই এ দোয়া পড়ে তারপর যে আবেদন করে তা কবুল হবে, এবং যথাযথ অজু করে সালাত আদায় করলে তা কবুল হবে (তিরমিযী)
নামাযের জন্য মসজিদে যাওয়ার আগে পড়বেঃ
আল্লাহুম্মাজআল ফী ক্বালবী নুরাওঁ ওয়া ফী লিসানি নুরাওঁ ওয়াজআর ফী ছাময়ী নুরাওঁ ওয়াজআল ফী বাছারী নুরাওঁ ওয়াজআল মিন খালফী নুরাওঁ ওয়া মিন আমামি নুরাওঁ ওয়াজআল লী মিন ফাওক্বী নুরাওঁ ওয়া মিন তাহতী নুরাওঁ আল্লাহুম্মা আ’তিনী নুরাঁও।
অর্থঃ হে আল্লাহ্! আমার ক্বলবে নুর দিন, আমার জিহ্বায় নুর দিন, আমার কর্ণে নুর দিন, আমার চোখে নুর দিন, আমার পিছনে ও সামনে নুর দিন, আমার উপরে ও নীচে নুর দিন। হে আল্লাহ্ আমাকে নুর দিন।
ফজীলতঃ হযরত আবু সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত – যে ব্যক্তি সালাতের জন্য ঘর থেকে বেরোনোর সময় এ দোয়া পাঠ করে আল্লাহ্ তার জন্য সত্তুর হাযার ফিরিশতা নিয়োজিত করবেন যারা তার জন্য ক্ষমা পার্থনা করতে থাকবে। এবং সালাত শেষ হওয়া পর্যন্ত আল্লাহ্ তার দিকে অনুগ্রহের দৃষ্টিতে তাকাবেন। (যাদুল মা’আদ)।
ফজরের সুন্নাতের পর ফরজ নামাযের আগে পড়বেঃ
ছুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী ছুবহানাল্লাহিল আযীমি আস্তাগফিরুল্লাহ্
রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি ফজরের সুন্নাতের পর ফরজ নামাযের আগে ১০০ বার পড়বে দুনিয়া তার নিকট ফিরে আসবে (অর্থাৎ তার ধন-সম্পদে অশেষ বরকত হবে); আল্লাহ্ উক্ত দোয়ার প্রতিটি শব্দ থেকে এক একজন ফিরিশতা সৃষ্টি করে কিয়ামত পর্যন্ত তসবীহ্ পাঠে নিযুক্ত করে দিবেন এবং তার সওয়াব এর পাঠকারী পেতে থাকবে। (তিরমিযী, এহ্‌ইয়া)।
প্রত্যেক ফরয নামাযের পরঃ
– রাসুলুল্লাহ্ নামাযের পর সালাম ফিরিয়ে এরুপ পড়তেন।
যে এরূপ আমল করবে তার ও জান্নাতের মধ্যে একটিই মাত্র প্রতিবন্ধক থাকে, আর তা হলো মৃত্যু। আর পরবর্তী নামায পর্যন্ত সে আল্লাহর যিম্মায় থাকে। (যাদুল মাআদ)
‘আস্তাগফিরুল্লাহ্’, ‘আস্তাগফিরুল্লাহ্’, ‘আস্তাগফিরুল্লাহ্’।
আয়াতুল কুরছী ১ বার।
আল্লাহুম্মা আন্তাচ্ছালামু ওয়া মিনকাচ্ছালামু ওয়া তাবারাকতা ইয়া যাল-যালালি ওয়াল ইকরাম (অর্থ- হে আল্লাহ্! আপনি শান্তি, আপনা থেকেই শান্তি, বরকতসমূহ আপনারই, হে গৌরব ও সম্মানের অধিকারী।) (এহ্ইয়া ২ খণ্ড)।
আল্লাহুম্মা আজেরনী মিনান্না-র (অর্থ- হে আল্লাহ্ আমি আপনার নিকট জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাই)
ফযীলত যে ব্যক্তি ফযরের পর ৭ বার এ দোয়া পাঠ করবে সেইদিন মৃত্যু হলে তার জন্য জাহান্নামের ৭ টি দরজাই নিষিদ্ধ করা হবে। অনুরুপ ভাবে সন্ধ্যায় (মাগরিবের পর) ৭ বার এ দোয়া পাঠ করবে সেইদিন মৃত্যু হলে তার জন্য জাহান্নামের ৭ টি দরজাই নিষিদ্ধ করা হবে। (রওয়ায়েত)।
প্রত্যেক নামাযের পরঃ
সুবহানাল্লাহ্ ৩৩ বার, আলহামদুলিল্লাহ্ ৩৩ বার, আল্লাহু আকবার ৩৩ বার এবং একবার লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াহিদা্হু লা-শারীকালাহু, লাহুল মুলক্ ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শা্য়্যিন ক্বাদীর।
ফযীলতঃ যে ব্যক্তি প্রত্যেক সালাতের পর উক্তরূপে তসবীহ্ পাঠ করে তার সকল গুনাহ্ মার্জিত হয়ে যায় যদিও তা সমুদ্রের ফেণরাশির মত অফুরন্ত হয়। (এহ্‌ইয়া)।
যে প্রত্যহ ১০০ বার ‘সুবহানাল্লাহি ও বিহামদিহী’ পাঠ করে তার পাপরাশি সমুদ্রের ফণরাশির ন্যায় অপরিসীম হলেও তা ক্ষমা করা হয়। (এহ্‌ইয়া)
সকাল-সন্ধ্যায়ঃ
হাসবিয়াল্লাহু লা-ইলাহা ইল্লা হুয়া আলাইহি তাওয়াক্কালতু ওয়া হুয়া রাব্বুল আরশিল আযীম। (যাদুল মাআদ)
অর্থ- আমার জন্য আল্লাহই যথেষ্ট, তিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, তারই উপর নির্ভর করছি, আর তিনি হচ্ছেন মহান আরশের অধিপতি।
ফযীলতঃ সকাল-সন্ধ্যায় ৭ বার পড়লে দুনিয়া ও আখিরাতের সকল চিন্তা ভাবনার জন্য আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট হবেন।
বিছমিল্লাহিল্লাযী লা ইয়াদুররু মাআ ইছমিহী শাইয়্যুন ফীল আরদ্বি ওয়া হুয়াচ্ছামীয়ুল আলীম। ৩ বার। (তিরমিযী, যাদুল মাআদ)
অর্থঃ আল্লাহর নামে (আমি এই দিন বা রাত শুরু করছি)- যার নামের বরকতে আসমান ও যমীনের কেউ কোন ক্ষতি করতে সক্ষম নয়। তিনি সব শুনেন ও জানেন।
ফযীলতঃ যে ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যায় এ দোয়া ৩ বার করে পাঠ করে তাকে সর্বপ্রকার ক্ষতি থেকেই হিফাজত করা হয়।
লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু, ওয়াহিদা্হু লা-শারীকালাহু, লাহুল মুলক্ ওয়া লাহুল হামদু ইউহ্‌য়ী ওয়া ইউমীতু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শা্য়্যিন ক্বাদীর।
ফযীলতঃ যে ব্যক্তি এ দোয়াটি ১০ বার পাঠ করবে সে ব্যাক্তি ইসমাঈলীয় বংশের ১০ জন গোলাম আযাদ করার পুণ্য লাভ করবে। তার ১০ টি গুনাহ্ মাফ করা হবে, এবং ১০ টি পদর্যাদা উন্নত করা হবে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শয়তান থেকে হিফাজতে থাকবে। তার চেয়ে সকলের চেয়ে বেশী পূণ্যের অধিকারী হবে যদি না কেউ তার চেয়ে বেশী এই দোয়া পাঠ করে থাকে। (যাদুল মাআদ)। এ দোয়াটি প্রতিদিন ১০০ বার পাঠ করলে বিশেষ ফযীলতের অধিকারী হবে। (বোখারী, মুসলিম, এহ্‌ইয়া)। যে ব্যক্তি বাজারে গিয়ে এ দোয়া পাঠ করে আল্লাহ্ তার জন্য এক লক্ষ নেকী লিখে দেন ও এক লক্ষ গুনাহ্ ক্ষমা করে দেন, আর তার জন্য বেহেশতে একটি গৃহ নির্মান করে রাখা হয়। (এহ্‌ইয়া)। যে ব্যক্তি দিনে ২০০ বার উক্ত কালাম পাঠ করে কেউই তার পূর্বে (জান্নাতে) যেতে পারবে না এবং কেউই তার নাগাল পাবে না। শুধু যে ব্যক্তি তার আমল থেকে উত্তম আমল করে তার কথা ভিন্ন। (এহ্‌ইয়া)।
আল্লাহুম্মা ইন্নী আছবাহ্‌তু আশহাদুকা, আশহাদু জুমলাতা আরশিকা ওয়া মালাইকাতিকা, ওয়া জামীআ খালক্বিকা, ইন্নাকা আনতাল্লাহুল্লাযী লা ইলাহা ইল্লা আন্তা, ওয়া আন্না মুহাম্মাদান আবদুকা ওয়া রাসুলুক। ৪ বার
অর্থ-হে আল্লাহ্ আমি সকাল করছি আপনাকে সাক্ষ্য রেখে, আরশবাহী ফিরিশতাদের সাক্ষ্য রেখে, সমস্ত সৃষ্টি জগতকে সাক্ষ্য রেখে – নিশ্চয়ই আপনিই সেই সত্বা যিনি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই, আর মুহাম্মদ সা. আপনার বান্দা ও রাসুল।
মাগরিবের পর উপরোক্ত দোয়ায় ‘আল্লাহুম্মা ইন্নী আছবাহতু’ এর স্থলে ‘আল্লাহুম্মা ইন্নী আমছাইতু’ অর্থাৎ ‘সকাল করছি’ এর বদলে ‘সন্ধ্যা করছি’ বলবে।
ফযীলতঃ যে ব্যক্তি এ দোয়া উল্লেখিত নিয়মে পড়বে, ১ বার পড়ার পর তার দেহের এক চতুর্থাংশ জাহান্নাম থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে দ্বিতীয় বার পাঠের পর অর্ধাংশ, তৃতীয়বার পাঠের পর তিন চতুর্থাংশ ও চতুর্থবার পাঠের পর সম্পূর্ণ অংশ জাহান্নাম থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। (যাদুল মাআদ)
রাদ্বী-তু বিল্লাহি রাব্বাও ওয়া বিল ইসলামি দ্বীনাও ওয়া বি মুহাম্মাদি নাবিয়্যা। ৩ বার।
অর্থঃ আমি সন্তুষ্ট আছি আল্লাহ্‌কে প্রতিপালক হিসাবে, ইসলামকে দ্বীন হিসাবে ও মুহাম্মদ সা. কে নবী হিসাবে পেয়ে।
ফযীলতঃ যে ব্যক্তি সকাল-সন্ধ্যায় (অর্থাৎ ফজর ও মাগরিবের পর) এ দোয়াটি ৩ বার করে পাঠ করবে তার উপর সন্তুষ্ট হওয়া আল্লাহর উপর দায়ীত্ব হয়ে যায়। (তিরমিযী)
ছুবহানাল্লাহি ওয়া আলহামদুলিল্লাহি, ওয়া লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার। প্রতিদিন ১০০ বার।
অর্থঃ আল্লাহ্ পবিত্র, সকল প্রশংসা তাঁরই, তিনি ব্যতীত আর কোন উপাস্য নেই। আল্লাহ্ সর্বশ্রেষ্ঠ।
ছুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহী আদাদা খালক্বীহি ওয়া রেদ’আ নাফছিহী ওয়া জ্বীনাতা আরশিহী ওয়া মিদাদা কালিমাতিহী।
অর্থঃ আমি আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করছি তার প্রশংসা সহকারে, তার সৃষ্টিরাজির সমপরিমান, তার স্বীয় সন্তুষ্টির অনুরূপ, তার আরশের ওজনের পরিমান এবং তার বানীসমূহ লিখনের কালির পরিমান।
আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা ইলমান নাফীয়্যান, ওয়া রিযকান তায়্যিবান, ওয়া আমালাম মুতাকাব্বালান।
অর্থঃ হে আল্লাহ্ আমি তোমার নিকট উপকারী ইলম, পবিত্র রিযিক এবং গ্রহণযোগ্য আমলের আবেদন করছি।
সাইয়্যিদুল ইস্তিগফারঃ
আল্লাহুম্মা আনতা রাব্বি লা ইলাহা ইল্লা আন্তা খালাক্বতানী ওয়া আনা আবদুকা, ওয়া আনা আলা আহ্‌দিকা, ওয়া ওয়া’দিকা মাছত্বোয়াতাতু, আউযুবিকা মিন শাররি মা ছানা’তু, আবুউ লাকা বিনি’মাতিকা আলাইয়্যা, ওয়া আবুউ লাকা বিজাম্বি, ফাগফিরলী। ফা ইন্নাহু লা ইয়াগফিরুজ্জুনুবা ইল্লাহ আন্তা।(যাদুল মাআদ)।
অর্থঃ হে আল্লাহ্ তুমি আমার প্রতিপালক। তুমি ব্যতীত কোন উপাস্য নেই। আমাকে সৃষ্টি করেছ এবং আমি তোমার বান্দা। আর আমি সাধ্যমত তোমার অঙ্গিকার ও প্রতিশ্রুতির উপর কায়েম আছি। আমি মন্দ যা করেছি তা থেকে তোমার আশ্রয় চাই। আমার উপর তোমার প্রদত্ত নেয়ামতের স্বীকৃতি দিচ্ছি। আর আমার গুনাহ্‌গুলো স্বীকার করছি। অতএব আমাকে ক্ষমা কর। কারণ তুমি ছাড়া গুনাহ্ ক্ষমা করার আর কেউ নেই।
ফজিলতঃ রাসুল সা. বলেছেন, তোমাদের কেউ এ কথাগুলো সন্ধ্যা বেলায় বললে, অতপর সকাল হওয়ার আগেই তার মৃত্যু হলে তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়। অনুরূপভাবে তোমাদের কেউ তা সকাল বেলায় বললে, অতপর সন্ধ্যার আগেই তার মৃত্যু হলে তার জন্যও জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যায়। (বুখারী, তিরমিযী)
আস্তাগফিরূল্লাহিল আযীমিল্লাযী লা ইলাহা ইল্লা হুয়াল হায়্যুল কাইয়্যুম ওয়া আতুবু ইলাইহে ( অর্থঃ আমি আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থণা করছি যিনি ছাড়া আর কেউ উপাস্য নেই। তিনি চিরঞ্জীব চিরস্থায়ী এবং আমি তাঁর নিকট প্রত্যাবর্তনকারী।)
– হযরত আবু সাইদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে রাসুল সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি শয়নকালে ৩ বার উক্ত ইস্তিগফার পাঠ করে, আল্লাহ্ তার গুনাহ্ মাফ করে দেন যদিও তা সমুদ্রের ফণরাশি বা বৃক্ষের পত্ররাজি বা টিলার বালুরাশি বা দুনিয়ার দিনগুলির সমসংখ্যক হয়। (তিরমিযী)। রাসুল সা. আরও বলেছেন যে এরূপ বলে তার গুনাহসমূহ মার্জিত হয় যদিও সে জিহাদ থেকে পালিয়ে যায়। (এহ্‌ইয়া)।
ঘুমানোর আগে পড়বেঃ
ওযু সহকারে ঘুমাবে। ঘুমানোর আগ পড়বে- আল্লাহুম্মা বিইছমিকা আমুতু ওয়া আহ্‌ইয়া। অর্থঃ হে আল্লাহ্ আমি তোমার নামে ঘুমাই তোমার নামেই জাগরিত হই। হযরত হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান থেকে বর্ণিত- রাসুলুল্লাহ্ যখন ঘুমোতে ইচ্ছা করতেন তখন উক্ত দোআ পড়তেন। আবার ঘুম থেকে জাগ্রত হয়ে বলতেন, “আল-হামদুলি্ল্লাহিল্লাযী আহ্‌ইয়ানা বা’দামা আমাতানা ওয়া ইলাইহিন নুশুর। (বুখারী, মুসলিম, তিরমিযী)

তায়াম্মুম

তায়াম্মুমঃ-
“অতঃপর পানি না পাও তবে তোমরা পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করে নাও অর্থাৎ স্বীয় মুখ মন্ডল ও হস-দ্বয় মাটি দ্বারা মুছে ফেল”।–মায়িদা-৬।
      হযরত আম্মার ইবনে ইয়াসের(রাঃ) হইতে বর্নিত,নবী করিম(সঃ) আমাকে একটি কাজে পাঠিয়েছিলেন,তথায় আমার স্বপ্ন দোষ হয়েছিল।আমি পানি পাচ্ছিলামনা।তখন আমি গোসলের জন্য তায়াম্মুমের নিয়তে চতুষ্পদ জন-ুর ন্যায় কয়েক বার এদিক সেদিক মাটিতে গড়াগড়ি করলাম।অতঃপর নবী করিম(সঃ) এর কাছে ঘটনা বললাম,নবী(সঃ) আমাকে বললেন,তোমার জন্য এইটুকু যথেষ্ট হয়ে যেত যে,পবিত্র মাটিতে একবার হাত মারিয়া উভয় হাত এবং মুখমন-লকে মসেহ করে ফেলতে।অতঃপর হুজুর(সঃ) তা করে দেখালেন।*বোখারী ও মুসলীম*।
তায়াম্মুমের ফরজ সমুহ
১. নিয়ত করা।
২. সমস্ত মুখমন্ডল একবার মসেহ করা.
৩. দুই হাত কনুইসহ একবার মসেহ করা।
যেই সুমস্ত কারনে তায়াম্মুম করা যায়
১. পানি ব্যবহারের কারনে যদি কোন অসুস্ত ব্যক্তির রোগ বৃদ্ধির আশংকা থাকে।
২. পানি ব্যবহারের কারনে যদি রোগ মুক্তি বিলম্বিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
৩. অত্যাধিক শীতের সময়ে পানি ব্যবহারের কারনে প্রাননাশের বা রোগাত্রুান- হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে।তবে এই ক্ষেত্রে পানি গরম করে ব্যবহার করা উত্তম যদি পানি গরম করার অবস্থাও না থাকে তবে এক্ষেত্রে তায়াম্মুম করা যাবে।
৪. যদি একান-ই পানি না পাওয়া যায় কিংবা এক মাইল পথ পাড়ি দিতে হয় পানির জন্য তবে তায়াম্মুম করা যাবে।
৫. পানি সংগ্রহ করতে গেলে যদি শত্রু র্কতৃক আত্রুান- হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
৬. হায়েয-নেফাস শেষে পানি ব্যবহারে অক্ষম হলে।
৭. যদি পানি কিনতে হয় এবং পানি কেনার পয়সা সাথে না থাকে।
৮. সঙ্গে যে পানি আছে সে পানি ব্যবহার করলে যদি পানি পিপাসায় জীবন হানির আশংকা থাকে।
যেই সব কারনে তায়াম্মুম ভঙ্গ হয়
যেই সমস্ত কারনে ওযু ভঙ্গ হয় সেই সমস্ত কারনে তায়াম্মুমও ভঙ্গ হয়।

তাহাজ্জুদ নামাজের ফজিলত

তাহাজ্জুদ নামাজের ফজিলত

আল্লাহ আমাদের সৃষ্টি করেছেন, আলো, বাতাস পানি দিয়ে লালন-পালন করে যাচ্ছেন- সে কারণে তার বান্দা হিসেবে প্রতিদিন obligatory duty  হিসেবে ফরজ সালাত আদায় করতে হবে। বান্দা হিসেবে দৈনিক পাঁচবার হাজিরা দেয়ার জন্য ফরজ সালাত পড়তে হবে। ফরজ সালাতের বাইরে রয়েছে আরো অনেক ধরনের সালাত যেমন সুন্নাত, ওয়াজিব,মুস্তাহাব, সুন্নাতে মুয়াক্কাদা, সুন্নাতে জায়িদাহ, চাশতের সালাত, ইশরাকের সালাত, সালাতুত তসবিহ, সালাতুত তওবা,তাহাজ্জুদের সালাত, ইসতিখারার সালাত ইত্যাদি। এসব সালাতের বিভিন্ন মর্যাদা রয়েছে। তবে এর মধ্যে সর্বোত্তম ও সর্বোৎকৃষ্ট সালাত হচ্ছে সালাতুত তাহাজ্জুদ। তাহাজ্জুদের নামাজ নবী করিম সাঃ-এর ওপর ফরজ ছিল।
উম্মতের ওপর এটি ফরজ না হলেও সব সুন্নাত নামাজের মধ্যে এটিই উত্তম। তাহাজ্জুদ অর্থ ঘুম থেকে জাগা আর তাহাজ্জুদের সময় হলো ইশার নামাজ পড়ে ঘুমিয়ে তারপর অর্ধেক রাতের পর নামাজ আদায় করা। সুবহে সাদিকের আগ পর্যন্ত তাহাজ্জুদের ওয়াক্ত থাকে। গভীর রাতে ঘুম থেকে জেগে নামাজ আদায়ে সাওয়াব বেশি। পবিত্র মক্কা ও মদিনায় হারামাইন শারফাইন ও তাহাজ্জুদের সালাতের জন্য আজান দেয়া হয় এবং অতি গুরুত্বের সাথে আদায় করা হয়। পবিত্র কালামে পাকে এরশাদ হয়েছে, যারা শেষ রাতে ইবাদাত ও প্রার্থনা করেন তাদের প্রশংসাস্বরূপ কিয়ামত দিবসে বলবেনঃ ‘তারা রাতের সামান্য অংশই নিদ্রায় অতিবাহিত করত এবং রাতের শেষ প্রহরে তারা ক্ষমা প্রার্থনা করত। (সূরা) আযযারিয়াত আয়াত (১৭-১৮)
রাসূল সাঃ-কে সম্বোধন করে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাক আরো বলেন, ‘এবং রাতের কিছু অংশ তাহাজ্জুদ পড়তে থাকুন। এ আপনার এক অতিরিক্ত কর্তব্য। আশা করা যায়, আপনার প্রভু আপনাকে মাকামে মাহমুদে অধিষ্ঠিত করবেন। (সূরা আল ঈসরা আয়া ৭৯) তানভীরুল মিশকাত গ্রন্থের প্রণেতা ঈমান মহিউস সুন্নাহ বাগবী রাঃ তিরমিজি শরিফের বরাত দিয়ে উল্লেখ করেন হজরত আবু উমামাহ সাঃ ফরমায়েছেনঃ ‘তোমরা রাত জেগে (তাহাজ্জুদ) নামাজ পড়াকে বাধ্যতামূলক করে লও।’ হাদিস নং ১১৫৭/২
তাহাজ্জুদ নামাজ নফসের রিয়াজাত ও তরবিয়াতের এক বিশেষ মাধ্যম। কারণ তখন সুখশয্যা ত্যাগ করেই ইবাদতে মশগুল হতে হয়। এটি মন ও চরিত্রকে নির্মল ও পবিত্র করা এবং সত্য পথে অবিচল রাখার জন্য অপরিহার্য ও অতীব কার্যকর পন্থা। আল কুরআনের সূরা মুজ্জামিলে এর উল্লেখ করা হয়েছে ‘অবশ্যি রাতে ঘুম থেকে ওঠা মনকে দমিত করার জন্য কুব বেশি কার্যকর এবং সে সময়ের কুরআন পাঠ বা জিকর একেবারে যথার্থ।’ (আয়াতঃ ৬ সূরা আল ফুরকান-এর ৬৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে ‘আল্লাহর প্রিয় বান্দা তারা, যারা তাদের রবের দরবারে সিজদা করে এবং দাঁড়িয়ে থেকেই রাত কাটিয়ে দেয়।’- ইসলামের প্রাথমিক যুগে কুফর সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে মুসলমানদের বিজিত হওয়ার পেছনে মূল ভূমিকা ছিল যে, তারা রাতের শেষ ভাগে আল্লাহতায়ালার মহান দরবারে চোখের পানি ফেলতেন এবং ক্ষমা প্রার্থনা করতেন। ‘তারা ছিল কঠিন পরীক্ষায় পরম ধৈর্যশীল, অটল-অবিচল, সত্যের অনুসারী,পরম অনুগত। আল্লাহর পথে ধন-সম্পদ উৎসর্গকারী এবং রাতের শেষ প্রহরে আল্লাহর কাছে এবং ভুলত্রুটির ক্ষমাপ্রার্থী। (সূরা আলে ইমরান আয়াত ১৭)
হাদিস শরিফেও তাহাজ্জুদের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মিশকাতুল মাসাবিহ গ্রন্থকার সুনানে আহমদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, “আবু হোরায়রা রাঃ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ সাঃ-কে বলতে শুনেছি। আফজালুস সালাতি বাদাল মাফরুদাতি সালাতুল লাইলি” অর্থাৎ ফরজ নামাজের পর সবচেয়ে উত্তম নামাজ হলো তাহাজ্জুদের নামাজ। হাদিস নম্বর ১১৬৭/২। হজরত আবু হোরায়রা রাঃ হতে বর্ণিত অপর এক হাদিসে রাসূল সাঃ ফরমায়েছেন, ‘আল্লাহ প্রতি রাতেই নিকটবর্তী আসমানে অবতীর্ণ হন যখন রাতের শেষ তৃতীয় ভাগ অবশিষ্ট থাকে। তিনি তখন বলতে থাকেন কে আছো যে আমায় ডাকবে, আর আমি তার ডাকে সাড়া দেবো? কে আছো যে আমার কাছে কিছু চাইবে,আর আমি তাকে তা দান করব? কে আছো যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে আর আমি তাকে ক্ষমা করব? (বুখারি ও মুসলিম)-
শরহে সুন্নাহর বরাত দিয়ে মিশকাতুল মাসাবিহ গ্রন্থকার আবু সাঈদ খুদরি রাঃ বর্ণিত একটি হাদিসের উল্লেখ করেন। বলা হয়েছে, ‘রাসূল সাঃ ফরমায়েছেন তিন ব্যক্তির প্রতি আল্লাহ খুশি হন (হাসেন) এক. যে ব্যক্তি তাহাজ্জুদের জন্য ওঠেন এবং নামাজ পড়েন। দুই. জনতা, যারা নামাজের জন্য সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ায়। তিন. মুজাহিদ যারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করার জন্য সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ায়। (হাদিস নম্বর ১১৬০/২)
অনুরূপ অন্য আরেকটি হাদিস রয়েছে, হজরত জাবির রাঃ বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাঃ-কে বলতে শুনেছি। রাতের মধ্যে এমন একটি মুহূর্ত আছে যদি কোনো মুসলমান তা লাভ করে এবং আল্লাহর কাছে ইহ ও পরকালের কোনো কল্যাণ চায় আল্লাহ নিশ্চয়ই তাকে তা দেন। (মুসলিম)
উপরিউক্ত কুরআন ও হাদিসের বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় যে, সালাতসমূহের মধ্যে তাহাজ্জুদ অতি মর্যাদাকর সালাত। এই সালাত প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর পক্ষেই চড়থধয়মধপ করা উচিত। এই সালাতের মাধ্যমে হয়তো আল্লাহর নৈকট্য লাভ সহজ হবে। সৃষ্টিকর্তার সাথে যখন দূরত্ব কমে যাবে তখন সৃষ্টিকর্তা বান্দার দাবি রক্ষা করতে পারেন।
তাহাজ্জুতের নামাজে কি কোন বিশেষ নিয়ম রয়েছে ?
আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত রাসুল সাঃ তাহাজ্জুতে এগার রাকাত সালাত আদায় করতেন এবং তা ছিল তার স্বাভাবিক সালাত । সেই সালাতে তিনি এক একটি সিজদা এতো পরিমান দীর্ঘ করতেন যে , তোমাদের কেউ সিজদা থেকে তার মাথা তুলার আগে পঞ্চাশ আয়াত তিলাওয়াত করতে পারত । আর ফজরের ফরজ সালাতের আগে তিনি দু রাকাত সালাত । তারপর তিনি ডান কাঁতে শুইতেন যতক্ষন না সালাতের জন্য তার কাছে মুয়াজ্জিন আসতো । ১০৫৬
আরেকটি হাদিসঃএকজন লোক রাসুল সাঃ জিজ্ঞেস করলেন হে রাসুল সাঃ রাতের সালাত (তাহাজ্জুত) আদায়ের পদ্ধতি কি ? তিনি বললেন দু রাকাত করে । আর ফযর হয়ে যাবার আশঙ্কা করলে ১ রাকাত মিলিয়ে বিতর আদায় করে নেবে । ১০৭১
ইবন আব্বাস বর্ণনা করেন নবী করিম সাঃ এর রাতের সালাত ছিল ১৩ রাকাত এর (তাহাজ্জুত এবং বিতর সহ )১০৭২
এই থেকে প্রমানিত হয় যে তাহাজ্জুত এর সালাত অন্য সব সালাত এর মতন ই । কোন ব্যতিক্রম নাই এর নিয়মে । এই সূরা এতো বার ঐ সূরা অত বার পড়তে হবে এমন কোন বাধা নাই । কোথাও উল্লেখ ও নাই ।
আল্লাহ বলেছেন সালাত আদায়ের সময় তার বান্দার পক্ষে যতখানি সম্ভব কুরআন থেকে তিলাওয়াত করা ততখানি করতে (73:20)

নারী-পুরুষের নামাযের পদ্ধতি

“নারী-পুরুষের নামাযের পদ্ধতি একই”
পুরুষ ও মহিলার নামাযের নিয়ম বা পদ্ধতি একই রকম। সুতরাং মহিলারাও একই তরীকায় নামায পড়বে, যেইরূ পুরুষেরা নামায পড়ে থাকে। কারণ, (নারী-পুরুষ উভয় জাতির) উম্মতকে সম্বোধন করে রসূল (সাঃ) বলেছেন, “তোমরা ঠিক সেইভাবে নামায পড়, যেইভাবে আমাকে নামায পড়তে দেখেছ।”
সহীহ বুখারী, মুসলিম, মিশকাতঃ ৬৮৩নং।
আর উভয়ের নামায পৃথক হওয়ার ব্যাপারে কোন দলীলও নেই।
সুতরাং যে আদেশ শরীয়ত পুরুষদেরকে করেছে, সে আদেশ মহিলাদের জন্যও এবং যে সাধারণ আদেশ মহিলাদেরকে করেছে তাও পুরুষদের ক্ষেত্রে পালনীয় -যদি বিশেষ হওয়ার ব্যাপারে কোন প্রকার দলীল না থাকে। যেমন, “যারা সতী মহিলাদের উপর মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে, অতঃপর চারজন সাক্ষী উপস্থিত করে না, তাদের জন্য শাস্তি হল ৮০ কোড়া---।” (কুরআন মাজীদ ২৪/৪) পরন্তু যদি কেউ কোন সৎ পুরুষকে অনুরুপ অপবাদ দেয়, তবে তার জন্যও ঐ একই শাস্তি প্রযোজ্য।
সুতরাং মহিলারাও তাদের নামাযে পুরুষদের মতই দুই হাত তুলবে, পিঠ লম্বা করে রুকূ করবে, সিজদায় জানু হতে পেট ও পায়ের রলাকে দূরে রেখে পিঠ সোজা করে সিজদাহ করবে। তাশাহ্‌হুদেও সেইরুপ বসবে যেইরুপ পুরুষেরা বসে। উম্মে দারদা (রাঃ) তাঁর নামাযে পুরুষের মতই বসতেন। আর তিনি একজন ফকীহ্‌ (বিদ্বান) ছিলেন।
ইমাম বুখারী রহঃ রচিত আত্‌-তারীখুস স্বাগীরঃ ৯৫পৃ, ইমাম ইবনে হাজার রহঃ রচিত সহিহ বুখারীর ব্যখ্যাগ্রন্থ ফাতহুল বারীঃ ২/৩৫৫।
আর মহিলাদের জড়োসড়ো হয়ে সিজদাহ করার ব্যাপারে কোন হাদীস সহীহ নেই।
ইমাম নাসিরউদ্দিন আলবানী রহঃ এর সিলসিলাহ যায়ীফাহঃ ২৬৫২ নং।
এজন্যই ইমাম ইবরাহীম নাখয়ী রহঃ বলেন,
“নামাযে মহিলারা ঠিক তাই করবে, যেইরূপ পুরুষেরা করে থাকে।”
মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, সিফাতু স্বালাতিন নাবী (সাঃ), আলবানী ১৮৯পৃ:।
পক্ষান্তরে দলীলের ভিত্তিতেই নামাযের কিছু ব্যাপারে মহিলারা পুরুষদের থেকে ভিন্নরুপ আমল করে থাকে। যেমন:-
১. বেগানা পুরুষ আশে-পাশে থাকলে (জেহরী নামাযে) মহিলা সশব্দে কুরআন পড়বে না। (আলমুমতে’, শারহে ফিক্‌হ, ইবনে উষাইমীন ৩/৩০৪) যেমন সে পূর্ণাঙ্গ পর্দার সাথে নামায পড়বে। তাছাড়া একাকিনী হলেও তার লেবাসে বিভিন্ন পার্থক্য আছে।
২. মহিলা মহিলাদের ইমামতি করলে পুরুষদের মত সামনে না দাঁড়িয়ে কাতারের মাঝে দাঁড়াবে।
৩. ইমামের ভুল ধরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যে মহিলা পুরুষের মত ‘সুবহা-নাল্লাহ্‌’ না বলে হাততালি দেবে।
৪. মহিলা মাথার চুল বেঁধে নামায পড়তে পারে, কিন্তু (লম্বা চুল হলে) পুরুষ তা পারে না।
৫. অনেক মহিলা আছে, যারা মসজিদে বা বাড়িতে পুরুষদের নামায পড়া না হলে নামায পড়ে না, এটা ভুল। আযান হলে বা নামাযের সময় হলে ‘আওয়াল ওয়াক্তেই নামায পড়া মহিলারদের জন্য কর্তব্য।”
মুত্বাসাঃ ১৮৮-১৮৯পৃষ্ঠা।
রচয়িতা/ সঙ্কলকঃ শায়খ আবদুল হামীদ মাদানী ফাইযী।