Sunday, September 18, 2016

তেলাওয়াতের সেজদাহ ও সেজদার আয়াত

তেলাওয়াতের সেজদাহ ও সেজদার আয়াত

বিসমিল্লাহ। আলহামদুলিল্লাহ। ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসুলিল্লাহ।

(১) সেজদার আয়াত কি?

কুরআনুল কারীমে এমন কিছু আয়াত আছে, যেইগুলো পড়লে বা শুনলে সেজদাহ করতে হয়, এই আয়াতগুলোকে সেজদার আয়াত বলা হয়। সাধারণত, এই আয়াতগুলোতে আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সরাসরি সেজদাহ করার জন্য আদেশ করেছেন, অথবা কখনো উৎসাহিত করেছেন সেজদাহ করার জন্য। এজন্যে এই আয়াতগুলো পড়লে, আয়াতের হক্ক হিসেবে, আল্লাহর আদেশ পালনের জন্যে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একটা সেজদাহ করতেন। আমরা আমাদের প্রিয়নবীর অনুসারী হিসেবে সেই সুন্নতের অনুসরণ করি। সাধারণত কুরআনে বিভিন্ন চিহ্ন ও কথার দ্বারা স্পষ্ট বলা থাকে, এটা সেজদার আয়াত।

(২) কুরআনে সেজদার আয়াত কয়টি ও কি কি?

এ ব্যপারে আলেমদের মাঝে কিছুটা ইখতিলাফ বা মতবিরোধ হয়েছে। তবে অনেক আলেম কুরআনে মোট ১৫টি সেজদার আয়াত রয়েছে বলে একমত পোষণ করেছেন। আর সেই আয়াতগুলো হচ্ছেঃ
সুরা আরাফঃ ২০৫, সুরা রাদঃ ১৫, সুরা নাহলঃ ৪৯, সুরা বনী ইসরাঈলঃ ১০৭,  সুরা মারিয়ামঃ ৫৮, সুরা হাজ্জঃ ১৮, সুরা হাজ্জঃ ৭৭, সুরা ফুরক্বানঃ ৬০, সুরা নমলঃ ২৫, সুরা সাজদাহঃ ১৫, সুরা ছোয়াদঃ ২৪, সুরা হা মীম সাজদাহঃ ৩৭, সুরা নজমঃ ৬২, সুরা ইনশিক্বাকঃ ২১, সুরা আলাক্বঃ ১৯।

(৩) সেজদার আয়াত পড়লে বা শুনলে সেজদাহ দেওয়ার হুকুম কি?

আল্লামাহ আব্দুল আজিজ বিন বাজ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, নামাযের ভেতরে কিংবা বাইরে, সেজদাহর আয়াত পড়লে বা শুনলে একটা সেজদাহ দেওয়া সুন্নত, ফরয কিংবা ওয়াজিব নয়। মাজমু ফাতওয়া ওয়া মাক্বালাত সামাহাত আল-শায়খ ইবনে বাজ, ১১/৪০৬। 
আল্লামাহ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল-উসায়মিন রাহিমাহুল্লাহ বলেন,সেজদাহর আয়াত পড়লে বা শুনলে তার জন্যে একটা সেজদাহ দেওয়া সুন্নত, ফরয কিংবা ওয়াজিব নয়। মাজমু আল-ফাতওয়াঃ ১৪/৩১৮।

(৪) তেলাওয়াতের সেজদাহ কিভাবে করতে হয়?

নামযের ভেতরে কিংবা বাইরে সেজদার আয়াত পড়া বা শোনার পরতাকবীর দিয়ে (অর্থাৎ, আল্লাহু আকবার) বলে সরাসরি সেজদাতে চলেযেতে হবে। সেজদাতে যাওয়ার পর স্বাভাবিক নামাজের সেজদার মতোইসুবহানা রাব্বীয়্যাল আলা তাসবীহ পড়তে হবে। এরপরে কেউ যদি অন্যান্য সেজদার তাসবীহ পড়তে চায়, পড়তে পারবে। যেকোন সেজদাতে অন্তত সুবহানা রাব্বীয়্যাল আলা এই তাসবীহ পড়া ওয়াজিব। এর অতিরিক্ত অন্য তাসবীহগুলো (যেমন- সুবহানাকা আল্লাহুম্মা রাব্বানা ওয়াবি হামদিকাআল্লাহুম্মাগ ফিরলী) পড়া সুন্নত বা মুস্তাহাব। উল্লেখ্য, তেলাওয়াতের সেজদাহর জন্যে বিশেষ একটা দুয়া আছে, সেই দুয়াটা মুখস্থ থাকলে সেটা পড়া আরো ভালো। আপনারা সেই দুয়াটা মুখস্থ করতে চাইলে হিসনুল মুসলিম বই থেকে দেখে নিন। তাসবীহ পড়া শেষ হলে, একটা মাত্র সেজদাহ দিয়েই দাঁড়িয়ে যেতে হবে। কারণ, তেলাওয়াতের সেজদার জন্যে সেজদা করতে হয় মাত্র একটা, দুটো নয়। উল্লেখ্য, যদি নামাযের মধ্যে হয় তাহলে আল্লাহু আকবার তাকবীর দিয়ে দাঁড়াতে হবে। আর যদি নামাযের বাইরে হয় তাহলে একটা সেজদাহ দিয়ে দাঁড়িয়ে যাবে, আল্লাহু আকবর বলতে হবেনা বা সালাম ফেরাতে হবেনা। এহচ্ছে তেলাওয়াতের সেজদার সুন্নতী পদ্ধতি।

(৫) তেলাওয়াতের সেজদাহ করার কি ফযীলত?

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আদম সন্তান যখন কোন সেজদার আয়াত পড়ে অতঃপর সেজদাহ করে, তখন শয়তান তার কাছ থেকে কাঁদতে কাঁদতে চলে যায় আর বলেঃ হায় আফসোস, আমার কি দুর্ভাগ্য! আদম সন্তানকে সেজদাহ করতে আদেশ করা হয়েছে, আর সে সেজদাহ করেছে। একারণে তাকে জান্নাত দেওয়া হবে। আর আমাকে সেজদাহ করতে আদেশ করা হয়েছিলো, কিন্তু আমি সেই আদেশ অমান্য করেছিলাম। একারণে আমি জাহান্নামে যাবো। সহীহ মুসলিম, মুসনাদে আহমাদ, ইবনে মাজাহ।

(৬) সুরা মুখস্থ করার সময় সেজদার আয়াত বারবার পড়লে কয়টা সেজদাহ দিতে হয়?

আল্লামাহ মুহাম্মদ বিন সালেহ আল-উসায়মিন রাহিমাহুল্লাহ বলেনকেউ যদি মুখস্থ করার জন্যে একই সেজদার আয়াত বারবার পড়ে, তাহলে প্রথম একবার পড়ার পরে একটা সেজদাহ দিলেই হবে। এরপরে সে যখন একই সেজদার আয়াত পুনরায় পড়বে, তখন আবার সেজদাহ না দিলেও হবে।মাজমু আল-ফাতওয়াঃ ১৪/৩১৮।

(৭) তেলাওয়াতের সিজদার জন্য ওযু থাকা ফরয কি না?

এ ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ বলেছেন, ওযু থাকতেই হবে। কোন কোন আলেম বলেছেন তেলাওয়াতের সিজদারজন্যে ওযু থাকা ফরয নয়, ওযু ছাড়াও তেলাওয়াতের সিজদাহ করা যাবেকারণ, আব্দুল্লাহ বনে মার রাদিয়াল্লাহু আনহু ওযু ছাড়াই তেলাওয়াতেরসেজদা করতেন।  এখান থেকে অনেক আলেম দলিল নিয়েছেন, যেহেতু তেলাওয়াতের সিজদা কোন নামায নয়, একটা সেজদাহ, আর কুরআন বা হাদীসে কোথাও তেলাওয়াতের সিজদার জন্যে ওযু থাকতেই হবে, একথা উল্লেখ নেই, তাই ওযু সহ কিংবা ওযু ছাড়া, সর্বাবস্থাতেই তেলাওয়াতের সিজদাহ করা যাবে। মাজমু ফাতওয়া ওয়া মাক্বালাত সামাহাত আল-শায়খ ইবনে বাজ, ১১/৪০৬। 

(৮) মোবাইল, কম্পিউটার কিংবা অডিও ভিডিও রেকর্ডিং থেকে কুরআন তেলাওয়াত শোনার সময় কি তেলাওয়াতের সিজদাহ করতে হবে?

নাহ, করতে হবেনা। অনেক আলেমের মতে, রেকর্ডিং থেকে কুরআন তেলাওয়াত শোনার সময় তেলাওয়াতের সিজদাহ করার প্রয়োজন নেই। 

শায়খ আব্দুল আজিজ বিন বাজঃ মাজমু ফাতওয়া শায়খ ইবনে বাজ ১১/৪১৫; মুহাম্মদ বিন সালেহ আল-উসায়মিনঃ আল-শরাহ আল-মুমতি ৪/১৩৩। 

দ্বীনদার ও নেক সন্তান লাভের উপায়

দ্বীনদার ও নেক সন্তান লাভের উপায়

সন্তান-সন্তুতি দানের ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ তা’আলার হাতে। আল্লাহ তা’আলা মানুষকে যত চাহিদা ও আকর্ষণ দান করেছেন,
তার মধ্যে সন্তান-সন্তুতির আকর্ষণ সবচেয়ে বেশি। সুতরাং প্রত্যেক মানুষের উচিত আল্লাহ তা’আলার নিকট নেক সন্তানের
কামনা করা। আর যাদের সন্তান হয় না। তাদের উচিত আল্লাহর শেখানো ভাষায় আল্লাহ তাআলার নিকট দুআ’ করা।

দুআ'র উৎস:
হজরত জাকারিয়া আলাইহিস সালাম বার্ধক্য পর্যন্ত নিঃসন্তান ছিলেন। তিনি দেখতে পেলেন আল্লাহ তাআলা ফলের মৌসুম ছাড়াই হজরত মারইয়াম আলাইহিস সালামকে ফল দান করে রিজিকের ব্যবস্থা করেন। তখন তাঁর মনে সন্তানের জন্য সুপ্ত আকাঙ্ক্ষা জেগে উঠল। তিনি সাহস পেলেন যে, আল্লাহ বৃদ্ধ দম্পতিকেও সন্তান দান করতে পারেন। তাই তিনি আল্লাহর দরবারে উক্ত দুআ’টি করেন। আর সন্তান হওয়ার জন্য দু’আ করা পয়গাম্বরগণের সুন্নাত।

দুআ'টি হলো :



রাব্বি হাবলি মিল্লাদুনকা জুররিয়্যাতান ত্বাইয়্যিবাতান, ইন্নাকা সামিউ’দ দুআ’ই

(সূরা আল-ইমরান : আয়াত ৩৮)
অর্থাৎ হে আমাদের প্রভু! আপনার নিকট থেকে আমাকে পূত-পবিত্র সন্তান দান করুন।
নিশ্চয় আপনি প্রার্থনা কবুলকারী।

সুতরাং আমরা সন্তান-সন্তুতি কামনায় দুনিয়ার কোনো মানুষের কাছে সন্তান কামনা করব না। কোনো অবৈধ ও অনৈসলামিক উপায় অবলম্বন না করে আল্লাহ ওপর ভরসা করে উক্ত দুআ’টি নিয়মিত পাঠ করি। আল্লাহ আমাদের নেক সন্তান দান করবেন। আল্লাহ আমাদেরকে কুরআনের ওপর আমল করার তাওফিক দান করুন।

নেক সন্তান লাভের জন্য আরও কিছু আমল আছে যা সঠিক ভাবে পালন করা জরুরি। আমল গুলো হলো:

১। স্বামী-স্ত্রী উভয়ই পাক পবিত্র থাকতে হবে।
২। কোন শিশু বা পশুর সামনে সংগমে রত হবে না
৩। মুস্তাহাব হলো “বিসমিল্লাহ” বলে সহবাস শুরু করা।
ভুলে গেলে যখন বীর্যপাতের পূর্বে মনে মনে পড়ে নেবে।
৪। সহবাসের পূর্বে সুগন্ধি ব্যবহার করাও আল্লাহর রাসুলের [সা.] সুন্নত।
৫। দুর্গন্ধ জাতীয় জিনিস পরিহার করা উচিত। উল্লেখ্য যে , ধুমপান কিংবা অপরিচ্ছন্ন থাকার কারণে দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়। আর এতে কামভাব কমে যায়। আগ্রহের স্থান দখল করে নেয় বিতৃষ্ণা।
৬। পর্দা ঘেরা স্থানে সংগম করবে।
৭। সংগম শুরু করার পূর্বে শৃঙ্গার করবে।
৮। কোনোভাবেই কেবলামূখী না হওয়া।
৯। স্বামী-স্ত্রী উভয়ই একেবারে উলঙ্গ হবে না।
১০। বীর্যপাতের পর ততক্ষণাত বিচ্ছিন্ন হবে না, বরং স্ত্রীর বীর্যপাত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে।
১১। বীর্যপাতের সময় মনে মনে নির্ধারিত দোয়া পড়বে।
কেননা যদি সে সহবাসে সন্তান জন্ম নেয় তাহলে সে শয়তানের প্রভাব মুক্ত হবে।
১২। নিয়ত ঠিক করুন। হযরত আলী (রা.) তাঁর অসিয়ত নামায় লিখেছেন যে, সহবাসের ইচ্ছে হলে এই নিয়তে সহবাস করতে হবে যে, আমি ব্যভিচার থেকে দূরে থাকবো। আমার মন এদিক ওদিক ছুটে বেড়াবেনা আর জন্ম নেবে নেককার ও ভালো সন্তান। এই নিয়তে সহবাস করলে তাতে সওয়াব তো হবেই সাথে সাথে উদ্যেশ্যও পূরণ হবে, ইনশাআল্লাহ।

Sunday, August 21, 2016

প্রতিদিনে রুকইয়া ও ঝাড়ফুঁক


প্রতিদিনে রুকইয়া ও ঝাড়ফুঁক

চোখের নজর, কালো যাদু, তাবীজ-কবজ, এক্সিডেন্ট, রোগ-ব্যাধি, জিনের আসর; এমন যেকোন বিপদ-আপদ ও ক্ষয়-ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্যে এই দুয়াগুলো পড়তে হয়। এই দুয়াগুলো ওযু ছাড়া, শুয়ে-বসে, যেকোন অবস্থাতেই পড়া যাবে, এমনকি নারীরা ঋতু অবস্থাতেও পড়তে পারবেন। আকস্মিক কোন ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্যে প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় এই দুয়াগুলো পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। আল্লাহ আমাদের সকলকে তোওফিক দান করুন, আমিন।
(১) জিনের আসর ও দুষ্ট জিনের ক্ষতি থেকে বাচার জন্য আমলঃ
জিনেরা মানুষের উপর আসর করে মানুষের মন-মেজাজ, চিন্তা ভাবনা এমনকি কাজের উপর অনেক প্রভাব বিস্তার করতে পারে। অনেক দুষ্ট জিন মানুষের বিশেষ করে মুমিনদের ক্ষতি করে থাকে। একজন সাহাবী রাতের বেলা একাকী সফরে বের হয়েছিলেন, জিনেরা তাঁকে তীর বিদ্ধ করে হত্যা করেছিলো। অন্য এক সাহাবীর ঘরে একটা জিন সাপ হয়ে বসে ছিলো। ঐ সাহাবী যখন তাকে সাপ মনে করে হত্যা করতে যান, তখন ঐ জিন তাকে দংশন করে হত্যা করে ফেলে। জিনের ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকার সহজ একটি আমল হচ্ছে প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় একবার করে আয়াতুল কুরসী পড়া। 
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি সকাল বেলা আয়াতুল কুরসী পাঠ করবে, তাকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জিনদের থেকে রক্ষা করা হবে। আর যে ব্যক্তি সন্ধ্যা বেলা আয়াতুল কুরসী পাঠ করবে, তাকে সকাল পর্যন্ত জিনদের থেকে রক্ষা করা হবে।” [সহীহ তারগীব ওয়াত-তারতীবঃ হা/৬৬২]
নোটঃ সুরা বাকারার ২৫৫ নাম্বার আয়াতকে “আয়াতুল কুরসী” বলা হয়।
নিয়মিত আয়াতুল কুরসী পড়লে যাদু, চোখের নজর, জিনের ক্ষতি ও অন্যান্য বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করে। আর প্রত্যেক ফরয সালাতের পরে একবার পড়লে মৃত্যুর পরে বিনা হিসেবে জান্নাত।
আবু উমামা রাদিয়াল্লাহু আ’নহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি প্রত্যেক ফরয সালাতের পর আয়াতুল কুরসী পাঠ করে, মৃত্যু ছাড়া আর কিছুই তাকে জান্নাতে প্রবেশ করা থেকে বিরত রাখতে পারবেনা”। [নাসায়ী, ইবনু হিব্বান, হাদীস সহীহ] 
(২) প্রতিদিন সকাল ও সন্ধ্যায় সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক্ব ও সুরা নাস তিন বার করে পড়া। এখানে ‘সকাল’ অর্থ হচ্ছে ফযর সালাতের পর থেকে যোহর পর্যন্ত যেকোন সময়, আর ‘সন্ধ্যা’ হচ্ছে আসর থেকে নিয়ে মাগরিবের মধ্যবর্তী যেকোন সময়। এর ফযীলত হচ্ছে, এই আমল যেকোন (ক্ষতিকর) জিনিস থেকে নিরাপত্তা দেবে।
আব্দুল্লাহ ইবনে খুবাইব রাদিয়াল্লাহু আ’নহু হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বললেন, “সকাল-সন্ধ্যায় ‘ক্বুল হুওয়াল্লাহু আহাদ’ (সুরা ইখলাস) এবং ‘ক্বুল আঊযু বিরাবিবল ফালাক্ব’ (সুরা ফালাক্ব) ও ‘ক্বুল আঊযু বিরাবিবন্নাস’ (সুরা নাস) তিনবার করে পড়। তাহলে যেকোন (ক্ষতিকর) জিনিস থেকে নিরাপত্তার জন্য এই আমল তোমার জন্য যথেষ্ট হবে।” [তিরমিযীঃ ৩৫৭৫, আবু দাউদঃ ৫০৮২, নাসায়ীঃ ৫৪২৮, হাসান সহীহ বলেছেন ইমাম তিরমিযী, শায়খ আলবানী]
পড়ার নিয়মঃ প্রথমে “আ’উযু বিল্লাহিমিনাশ-শাইতানির রাযীম” পড়ে এরপর “বিসমিল্লাহির-রাহ’মানির রাহীম” পড়ে সুরা ইখলাস, সুরা ফালাক, সুরা নাস; এইভাবে একবার করে পড়ার পরে এই সিরিয়ালে আরো দুইবার রিপিট করতে হবে। প্রত্যেক সুরার পূর্বে শুধু “বিসমিল্লাহির-রাহ’মানির রাহীম” পড়তে হবে।
(৩) দশজন দাস মুক্ত করার সমান সওয়াব ও অনেক বড় ফযীলতের একটা দুয়াঃ
لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيكَ لَهُ، لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ يُحْيِي وَيُمِيتُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ
উচ্চারণঃ লা ইলা-হা ইল্লাল্লা-হু ওয়াহ’দাহু, লা শারীকালাহু, লাহুল মুলকু ওয়ালাহুল হা’মদু, ইয়ুহ-য়ী ওয়াইয়ুমীতু, ওয়াহুয়া আ’লা কুল্লি শাই’ইন ক্বাদীর। 
অর্থঃ একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কোনো সত্য মাবূদ নেই, তাঁর কোনো শরীক নেই, রাজত্ব তাঁরই এবং সমস্ত প্রশংসা তাঁর। তিনিই জীবন দান করেন এবং তিনিই মৃত্যু দান করেন। আর তিনি সকল কিছুর উপর ক্ষমতাবান।
এই দুয়া ফযর ও মাগরিবের ফরয নামায পড়ার পর পড়লেঃ
(ক) আল্লাহ তাআ’লা ঐ ব্যক্তির জন্য একদল সশস্ত্র ফেরেশতাদেরকে পাঠাবেন, যারা তাকে সকাল পর্যন্ত যেকোন ক্ষতি হতে পাহারা দিয়ে রাখবেন। 
(খ) তার জন্য দশটি নেকী লিখে দেওয়া হবে। 
(গ) তার আমলনামা থেকে দশটি ধ্বংসাত্মক গুনাহ মুছে দেওয়া হবে। 
(ঘ) দশজন ঈমানদার দাস মুক্ত করার সমান সওয়াব তার আমলনামায় লেখা হবে। 
[সুনানে তিরমিযীঃ ৩৫৩৪, হাদীসটি হাসান সহীহ, দারুস সালাম তাহকীক] 
বিঃদ্রঃ এই ফযীলত পাওয়ার জন্য যদি কোনো অসুবিধা যদি না থাকে তাহলে ফযর ও মাগরিবের ফরয নামায পড়ে সুন্নত নামায পড়ার পূর্বেই এবং জায়নামাযে বসেই দুয়াটা পড়তে হবে, সুন্নতের পরে নয়। আর লক্ষ্য করুন দুয়াটাতে অতিরিক্ত “ইয়ুহ্য়ী ওয়াইয়ূমীতু”, এই কথাটা অতিরিক্ত আছে, এটাসহ পড়তে হবে। 
(৪) হঠাৎ কোন বিপদ-আপদ ও দুর্ঘটনা থেকে নিরাপদ থাকার জন্য আমলঃ 
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি সকালে তিনবার ও সন্ধ্যায় তিনবার এই দুয়া পড়বে, কোনো কিছুই ঐ ব্যক্তির ক্ষতি করতে পারবেনা।”
بِسْمِ اللهِ الَّذِي لاَ يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الأَرْضِ وَلاَ فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ العَلِيمُ
উচ্চারণঃ বিসমিল্লা-হিল্লাযী লা ইয়াদুররু মা আ’সমিহী শাই’উন ফিল আরদি, ওয়ালা ফিস-সামায়ী, ওয়াহুয়াস সামীউ’ল আ’লীম। (তিন বার)।
বাংলা অর্থঃ আমি সেই আল্লাহর নামে শুরু করছি, যার নামে শুরু করলে আসমান ও যমীনের কোনো কিছুই কোনো ক্ষতি করতে পারেনা। প্রকৃতপক্ষে তিনি সর্বশ্রোতা, মহাজ্ঞানী। (তিনবার)।
[আবু দাউদ, তিরমিযীঃ ৩৩৮৮, ইবনে মাজাহঃ ৩৮৬৯, মুসনাদে আহমাদঃ ৪৪৮। হিসনুল মুসলিম, পৃষ্ঠা ১৩৮। শায়খ আলবানীর মতে হাদীসটি হাসান।]
ঘুমানোর পূর্বে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নতী আমলঃ
(৫) আয়াতুল কুরসী পাঠ করা। ঘুমানোর পূর্বে আয়াতুল কুরসী পাঠ করার ফযীলতঃ
(ক) সকাল পর্যন্ত তার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন হেফাজতকারী (ফেরেশতা) তাকে নিরাপত্তা দেবে। (খ) শয়তান তার কাছে আসতে পারবেনা।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম একজন সাহাবীকে বলেছিলেন, “যখন তুমি বিছানায় ঘুমুতে যাবে তখন আয়াতুল কুরসী পাঠ করবে, তাহলে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমার উপর সব সময় একজন হেফাযতকারী নিযুক্ত থাকবে এবং ভোর পর্যন্ত শয়তান তোমার ধারে কাছেও আসতে পারবে না।” [সহীহ বুখারী, খন্ড ৬, অধ্যায় ৬১, হাদিস নং ৫৩০]
[এখানে হাদীসটা আসলে সংক্ষেপে উল্লেখ করা হয়েছে। এটা আসলে এক জিনের সাথে এক সাহাবীর আশ্চর্যজনক দীর্ঘ একটা ঘটনার ছোট্ট একটা অংশ। সম্পূর্ণ কাহিনীটা জানার জন্য আপনারা রিয়াদুস সালেহীন এর বই ৯, হাদিস নং- ১০২২ থেকে দেখে নিতে পারেন।
(৬) ঘুমানোর পূর্বে সুরা বাক্বারার শেষ দুই আয়াত পড়া। 
ঘুমানোর পূর্বে সুরা বাক্বারার শেষ দুই আয়াত (২৮৫+২৮৬) পড়ার ফযীলতঃ
(ক) রাত জেগে তাহাজ্জুদ সালাত আদায় করার সমান সওয়াব পাওয়া যাবে। 
(খ) বালা-মুসিবত ও যেকোনো ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য যথেষ্ঠ হবে।
(গ) জিন ও শয়তানের ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য যথেষ্ঠ হবে।
(ঘ) আয়াতগুলো পড়ে শেষ “আমিন” বললে আয়াতগুলোতে যেই দুয়া আছে সেইগুলো আল্লাহ তাআ’লা কবুল করে নেন।
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি রাতের বেলা সুরা বাকারার শেষ দুই আয়াত পড়বে, সেটা তার জন্য যথেষ্ঠ হবে।” [সহীহ বুখারিঃ ৫০১০, সহীহ মুসলিমঃ ৮০৭]
বিখ্যাত হাদীসের গ্রন্থ “রিয়াদুস সালেহীন” এর লেখক ও সহীহ মুসলিমের ভাষ্যকার, ইমাম আন-নববী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “এর অর্থ কেউ বলেছেনঃ কিয়ামুল লাইল বা তাহাজ্জুদ সালাতের জন্য যথেষ্ঠ হবে। কেউ বলেছেনঃ শয়তানের ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য যথেষ্ঠ হবে। কেউ বলেছেনঃ বালা-মুসিবত থেকে নিরাপত্তা পাওয়া যাবে। তবে সবগুলো অর্থ সঠিক হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।” [শারহুন নববী আ’লা সহিহ মুসলিমঃ ৬/৩৪০, হাদীস ৮০৭]
সহীহ বুখারীর ভাষ্যকার, আমিরুল মুমিনিন ফিল হাদীস, ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী রাহিমাহুল্লাহ এই অভিমত সমর্থন করে বলেছেন, উপরের সবগুলো অর্থ নেওয়া সঠিক। আল্লাহ ভালো জানেন। প্রথম অর্থটি (তাহাজ্জুদের সমান সওয়াব পাওয়া) আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউ’দ রাদিয়াল্লাহু আ’নহু থেকে বর্ণিত একটি মারফু হাদীসে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। [ফাতহুল বারী ৮/৬৭৩, হাদীস ৫০১০]
এ কারণে আলী রাদিয়াল্লাহু আ’নহু বলেছেন “আমার মতে যার সামান্য জ্ঞান-বুদ্ধি আছে, সে এই দুইটি আয়াত পাঠ না করে নিদ্রা যাবে না”। [মানাকিবুস সাহাবা, ইমাম নবী রাহিমাহুল্লাহ এই কথার বর্ণনা সূত্রকে সহীহ বলেছেন, আল-আযকার]

Tuesday, June 28, 2016

মুনাজাতের জন্য জরুরী আরবী দুয়া সমূহ

মুনাজাতের জন্য জরুরী আরবী দুয়া সমূহঃ
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ্‌র জন্য। আল্লাহ দরূদ ও সালাম পেশ করুন আমাদের নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উপর; আর তাঁর বংশধর, তাঁর সাহাবীগণ এবং কিয়ামত পর্যন্ত যারা সুন্দরভাবে তাঁদের অনুসরণ করবে তাদের উপর (আমিন)।
দুয়া মানেই যে ওযু করে নামায পড়ে দুই হাত তুলে চাইতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। হ্যা, দুই হাত তুলে দুয়া করা ভালো। তবে আপনি যেকোনো সময় ওঠতে বসতে, কোথাও যেতে যেতে দুয়া করতে পারেন। এইভাবে দুয়া ও যিকিরের মাধ্যমে আমাদের অবসর সময়গুলো কাজে লাগানোর চেষ্টা করা উচিত। আল্লাহ আমাদের তোওফিক দান করুন, আমিন।
নিচের এই দুয়াগুলো হাত তুলে বা হাত না তুলে, যেকোন মুনাজাতে, ফরয, সুন্নত বা নফল যেকোন নামাযের যেকোন সিজদাতে, নামাযের শেষ অংশে অর্থাৎ আত্তাহিয়্যাতু ও দুরুদ পড়ার পরে সালাম ফেরানোর আগে দুয়া মাসুরা হিসেবে, বিতিরের কুনুতে, উঠতে বসতে যেকোনো সময়ই পড়া যাবে। দুয়াগুলো নামাযের ভেতরে আরবীতে পড়তে হবে, নামাযের বাইরে হলে আরবী বা বাংলা যেকোন ভাষাতেই করা যাবে।

১. সবচাইতে কম কথায় সবচাইতে বেশি কল্যান প্রার্থনা করার দুয়াঃ
এই দুয়াটা রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব বেশি বেশি করতেন।
“নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অধিকাংশ দো‘আ হতঃ
رَبَّنَآ اٰتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَّفِي الْاٰخِرَةِ حَسَـنَةً وَّقِنَا عَذَابَ النَّارِ
উচ্চারণঃ রব্বানা আ-তিনা ফিদ্দুনিয়া হা’সানাতাওঁ-ওয়াফিল আ-খিরাতি হা’সানাতাওঁ ওয়া-ক্বিনা আ’যাবান্নার।
অর্থঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে দুনিয়ার জীবনে কল্যাণ দান করো এবং পরকালের জীবনেও কল্যাণ দান করো। আর তুমি আমাদেরকে আগুনের শাস্তি থেকে বাঁচাও।
সুরা আল-বাক্বারাহঃ ।

২. পাপ থেকে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য দুয়াঃ
আমাদের আদিপিতা আদম (আঃ) ও মা হা’ওয়্যা (আঃ) আল্লাহর নিষেধ অমান্য করলে ক্ষমা প্রার্থনা ও তোওবা করার জন্য স্বয়ং আল্লাহ তাআ’লা তাদের দুইজনকে এই দুয়াটি শিখিয়ে দেন। এই দুয়ার মাধ্যমে ক্ষমা প্রার্থনা করলে আল্লাহ তাআ’লা তাদেরকে ক্ষমা করে দেন। আমাদের উচিত তাদের মতো আমাদের পাপ থেকে ক্ষমা প্রার্থনার জন্য নিয়মিত এই দুয়া করা।
رَبَّنَا ظَلَمْنَا أَنفُسَنَا وَإِن لَّمْ تَغْفِرْ لَنَا وَتَرْحَمْنَا لَنَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ
উচ্চারণঃ রাব্বানা যোয়ালামনা আন-ফুসানা ওয়া-ইল্লাম তাগ-ফিরলানা ওয়াতার্ হা’মনা লানা কুনান্না মিনাল খাসিরিন।
অর্থঃ হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা নিজেদের প্রতি যুলুম করেছি, অতএব আপনি যদি আমদেরকে ক্ষমা না করেন এবং আমাদের প্রতি দয়া না করেন তাহলে নিশ্চয়ই আমরা ক্ষতিগ্রস্থদের অন্তর্ভুক্ত হব।
আল-আ’রাফঃ ২৩।

৩. গুনাহ মাফ করার ও নেককার ঈমানদার হিসেবে মৃত্যুর জন্য দুয়াঃ
رَبَّنَا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرْ عَنَّا سَيِّئَاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ الْأَبْرَارِ
উচ্চারণঃ রাব্বানা ফাগফির লানা যুনুবানা ওয়া-কাফফির আ’ন্না সাইয়্যিআ-তিনা ওয়া তাওয়াফ্ফানা মাআ’ল আবরা-র।
অর্থঃ হে আমাদের পালনর্তা! আপনি আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দিন, আমাদের মন্দ কাজগুলো দূর করে দিন আর আমাদেরকে নেককার হিসেবে মৃত্যু দান করুন।
সুরা আলে ইমরানঃ ১৯৩।

৪. পিতা-মাতার জন্য দুয়াঃ
জীবিত বা মৃত পিতা মাতা দুইজনের জন্য এই দুয়া বেশি করতে হবেঃ
رَّبِّ ارْحَمْهُمَا كَمَا رَبَّيَانِي صَغِيرًا
উচ্চারণঃ রাব্বির হা’ম-হুমা কামা রাব্বা ইয়ানি সাগিরা।
অর্থঃ হে আমাদের পালনর্তা! আপনি আমার পিতা-মাতার প্রতি তেমনি দয়া করুন যেইরকম দয়া তারা আমাকে শিশু অবস্থায় করেছিল।

৫. ছোট্ট কিন্তু খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা দুয়াঃ
আল্লাহ যখন কারো ভালো করতে চান তখন তাকে অনেক টাকা পয়সা, ভালো স্বামী বা স্ত্রী, দামী গাড়ি দেননা। যদিও আমরা এইগুলোকেই কল্যানের বিষয় বলে মনে করি। পার্থিব সুখ স্বাচ্ছন্দ কখনো আল্লার নেয়ামত হতে পারে, কখনোবা আল্লাহর পরীক্ষা হতে পারে। কিন্তু আল্লাহ যখন কারো কল্যান করতে চান, তখন তাকে “ফিকহ” বা দ্বীনের গভীর জ্ঞান দান করেন।
আর সেই জ্ঞান চাওয়ার জন্য রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আ’লাইহি ওয়া সাল্লাম এর শেখানো সুন্দর ছোট্ট একটা দুয়া আছে, আপনারা মুখস্থ করে নিতে পারেন।

اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ عِلْماً نَافِعاً، وَرِزْقاً طَيِّباً، وَعَمَلاً مُتَقَبَّلاً
উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মা ইন্নী আস-আলুকা ই’লমান নাফিআ’ন, ওয়া রিযক্বান ত্বাইয়্যিবান, ওয়া আ’মালাম মুতাক্বাববালান।
অর্থঃ হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট উপকারী জ্ঞান, পবিত্র জীবিকা ও গ্রহণযোগ্য আমল প্রার্থনা করছি।
ইবনে মাজাহ, হিসনুল মুসলিম পৃষ্ঠা ১১৩।

এই দুয়াটা আমার প্রিয় কারণ, এর সাথে আরো দুইটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় চাওয়া হয়েছে – রিযকান ত্বাইয়্যিবান বা পবিত্র জীবিকা – এর দ্বারা দুনিয়াবি চাহিদার পূরণের জন্যও দুয়া করা হলো আর, আ’মালান মুতাক্বাব্বালান বা – এমন আমল যা আল্লাহর কাছে কবুল হয়, পরকালের জন্য যা প্রয়োজন তাও প্রার্থনা করা হলো। এতো গুরুত্বপূর্ণ তিনটা বিষয় একসাথে ছোট্ট একটা দুয়ার মধ্যে থাকায় আমাদের সবার শিখে নেওয়া উচিত।

এই দুয়া প্রত্যেকদিন ফযরের ফরয নামাযের সালাম ফেরানোর পর একবার পড়া সুন্নত। এছাড়া সিজদাতে, সালাম ফিরানোর আগেসহ যেকোনো সময় করা যাবে। আরবীতে না পারলে বাংলাতেও করা যাবে, যতদিন না মুখস্থ হচ্ছে। দুয়াটা পাওয়া যাবে হিসনুল মুসলিম বইয়ের ১১৩ নাম্বার পৃষ্ঠায়।

৬. হেদায়েতের উপর থাকা, অন্তর যেন দ্বীনের উপরে থাকে তার জন্য দুয়াঃ
আরবীতে হৃদয়কে বলা হয় ‘ক্বালব’, যার একটা অর্থ হচ্ছে - যেই জিনিস খুব দ্রুত পরিবর্তন হয়ে যায়। অর্থাৎ, মানুষের হৃদয় খুব দ্রুত পরিবর্তন হয়ে যায়, একারণে মানুষ আজকে যাকে ভালোবাসে, কাল তাকে ঘৃণা করে।
কেয়ামতের আগে এমন হবে মানুষ সকালে ঈমানদার থাকবে, সন্ধ্যা সময় কাফের হয়ে যাবে। আবার মানুষ সন্ধ্যা সময় ঈমানদার থাকবে, সকালে কাফের হয়ে যাবে। এইজন্য হৃদয় যাতে পরিবর্তন না হয়ে যায়, পাপাচার, কুফুরী, আল্লাহর নাফরমানির দিকে ঝুকে না পড়ে সেই জন্য আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বেশি বেশি করে এই দুয়া করতেনঃ

يَـا مُـقَـلِّـبَ الْـقُـلُـوْبِ ثَـبِّـتْ قَـلْـبِـىْ عَـلَـى دِيْـنِـكَ

উচ্চারণঃ ইয়া মুক্বাল্লিবাল ক্বুলুব! সাব্বিত ক্বালবী আ’লা দ্বীনিক।
অর্থঃ হে হৃদয় সমূহের পরিবর্তন করার মালিক! আমার হৃদয়কে তোমার দ্বীনের উপর অবিচলভাবে প্রতিষ্ঠিত রাখো।
সুনানে তিরমিযী।

رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِن لَّدُنكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنتَ الْوَهَّابُ
উচ্চারণঃ রব্বানা লা তুযিগ ক্বুলুবানা বাআ’দা ইয হাদাইতানা ওয়াহাব লানা মিল্লাদুনকা রাহ’মাহ, ইন্নাকা আনতাল ওহহাব।
অর্থঃ হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদেরকে হেদায়েত করার পর তুমি আমাদের অন্তরকে বাঁকা করে দিয়োনা এবং তোমার নিকট থেকে আমাদেরকে রহমন্ত দান কর। নিশ্চয়ই তুমি অত্যন্ত দয়ালু।
সুরা আলে ইমরানঃ ৮।
* অন্তরকে বাঁকা অর্থ হচ্ছে অন্তরে মুনাফেকী, কুফুরী, পাপাচার বা আল্লাহর অবাধ্যতা প্রবেশ করা।

৭. রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এর সুন্দর একটি দুয়াঃ
মুখস্ত করে নিতে পারেন ও মুনাজাতে বেশি বেশি করে আর বিশেষ করে সিজদাতে এই দুয়া করতে পারেন।
اَللهم إِنِّي أَسْأَلُكَ الهُدَى، وَالتُّقَى، وَالعَفَافَ، وَالغِنَى
আল্লা-হুম্মা ইন্নি আস-আলুকাল হুদা ওয়াত-তুকা ওয়াল আ'ফাফা ওয়াল গি’না।
অর্থ: হে আল্লাহ আমি তোমার কাছে হেদায়েত, তাকওয়া, সুস্থতা ও সম্পদ প্রার্থনা করছি।
মুসলিম ২৭২১, তিরমিযী ৩৪৮৯, ইবনু মাজাহ ৩৮৩২, আহমাদ ৩৬৮৪।

৮. ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় যেকোনো শিরক থেকে বাঁচার দুয়াঃ
কেউ ৪০ বছর আল্লাহর ইবাদত করলো, কতযে নফল সুন্নত নামায পড়লো, রোযা রাখলো - কিন্তু মরণের আগে শিরক করে তোওবা না করেই মারা গেলো... একটা মাত্র শিরক তার সমস্ত আমল নষ্ট করে দেবে (নাউযুবিল্লাহ)!
কেয়ামতের দিন তার আমলগুলোর কোনো ওযন আল্লাহ তাকে দেবেন না, এইগুলোকে ধূলো বালিতে রূপান্তরিত করে দেবেন।
আর জেনে হোক বা না জেনেই হোক যেকেউ, যেকোনো সময় শিরকে লিপ্ত হতে পারে, যে যত বড় নেককারই হোক না কেনো (মা যা' আল্লাহ)।
এইজন্য শিরক করা অথবা অনিচ্ছায় শিরকে লিপ্ত হওয়া থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতে হয়।
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) শেখানো একটা দুয়া আছে, কেউ যদি প্রতিদিন সকাল বিকাল একবার করে পড়েন, তাহলে আশা করা যায় আল্লাহ তাকে শিরক থেকে হেফাজত করবেন।
আপনি কি জানেন, সেই দুয়াটা কি?
দুয়াটা হচ্ছেঃ

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ أَنْ أُشْرِكَ بِكَ وَأَنَا أَعْلَمُ، وَأَسْتَغْفِرُكَ لِمَا لاَ أَعْلَمُ

উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মা ইন্নী আ’উযুবিকা আন উশরিকা বিকা ওয়া আনা আ’লাম, ওয়া আস-তাগফিরুকা লিমা লা আ’লাম।
অনুবাদঃ হে আল্লাহ! আমার জানা অবস্থায় তোমার সাথে শিরক করা থেকে তোমার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আর আমার অজানা অবস্থায় কোনো শিরক হয়ে গেলে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
আহমাদ ৪/৪০৩, হাদীসটি সহীহ, সহীহ আল-জামে ৩/২৩৩।
হিসনুল মুসলিমঃ পৃষ্ঠা ২৪৬।

৯. বিপদ বা দুঃশ্চিন্তার জন্য এই দুয়াটা সবাই মুখস্থ করে নিনঃ
তিমি মাছের পেটে থাকা অবস্থায় ইউনুস (আঃ) এই দোয়া করেছিলেন এবং কঠিন বিপদ থেকে উদ্ধার পেয়েছিলেন।
لاَ إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظّالِمِينَ
উচ্চারণঃ লা ইলা-হা ইল্লা-আনতা, সুবহা’-নাকা ইন্নি কুনতুম-মিনায-যোয়ালিমিন।
অর্থঃ "(হে আল্লাহ) তুমি ছাড়া আর কোনো মা’বুদ নাই, তুমি পবিত্র ও মহান! নিশ্চয় আমি জালেমদের অন্তর্ভুক্ত।"
কুরানুল কারীমে এই দুয়া বর্ণিত হয়েছে সুরা আল-আম্বিয়া: আয়াত নাম্বার ৮৭ তে। সঠিক আরবীর জন্য ছবিটা দেখুন।

এই দুয়ার উপকারীতাঃ রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “কোনো মুসলিম যদি এই দুয়া পড়ে, তার দুয়া কবুল করা হবে। অন্য হাদীস অনুযায়ী, এই দুয়া পড়লে আল্লাহ তার দুঃশ্চিন্তা দূর করে দিবেন।”
সুনানে আত-তিরমিযী।

দুয়া কিভাবে পড়তে হবেঃ বিপদ আপদ বা দুঃশ্চিন্তার সময় এই দুয়া বেশি বেশি করে পড়তে হয়। যতবার ইচ্ছা ও যতবার সম্ভব হয় ততবার পড়বেন। এক লক্ষ পঁচিশ হাজার পড়ে যে “খতম ইউনুস” পড়ানো হয় হুজুর বা মাদ্রাসা ছাত্রদেরকে টাকা দিয়ে ভাড়া করে, বা দুয়া কেনাবেচা করা হয় – এইগুলো বেদাত – এই রকম খতম করানোর কোনো দলীল নেই শরীয়তে।
আপনার যতবার সম্ভব হয় ততবার পড়বেন – এত এত বার পড়তে হবে, এমন কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম নেই। আপনি নিজের জন্য নিজে দুয়া করবেন - আল্লাহর কাছে সেটাই বেশি পছন্দনীয়।
সর্বোত্তম হচ্ছে – ফরয/নফল/সুন্নত যেকোনো নামাযের সিজদাতে এই দুয়া পড়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া।
আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর অতুলনীয় রহমতের ছায়ার মধ্যে আশ্রয় দিন, আমীন।

১০. আল্লাহর যিকর, শুকিরিয়া ও সুন্দরভাবে তাঁর ইবাদত করার জন্য সাহায্য চাওয়ার দুয়াঃ
اللَّهُمَّ أَعِنِّي عَلَى ذِكْرِكَ، وَشُكْرِكَ، وَحُسْنِ عِبادَتِكَ
“আল্লাহুম্মা আ ই’ন্নী আ’লা যিকরিকা ওয়া শুকরিকা ওয়া হু’সনি ইবাদাতিকা”।
অর্থঃ হে আল্লাহ! তুমি আমাকে তোমার স্মরণ, তোমার কৃতজ্ঞতা এবং তোমার সুন্দর ইবাদত করার ব্যাপারে আমাকে সাহায্য কর”।
এই দুয়া ইচ্ছা করলে নামাযের ভেতরে সিজদাতে বা সালাম ফেরানোর আগে দুয়া মাসুরার সময়ও করা যায়।
এই দুয়াটা এতো গুরুত্বপূর্ণ যে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এক সাহাবীকে এই দুয়া পড়ার জন্য বিশেষভাবে ওয়াসীয়ত করে যান। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) মুয়ায বিন জাবাল (রাঃ) এর হাত ধরে বলেছিলেনঃ ‘‘হে মুয়াজ! আল্লাহর কসম আমি তোমাকে ভালোবাসি। অতঃপর তিনি বললেন, হে মুয়াজ! আমি তোমাকে উপদেশ দিচ্ছি যে তুমি প্রত্যেক সালাতের পর এই দুয়া করা ত্যাগ করবেনা, “আল্লাহুম্মা আ ই’ন্নী আ’লা যিকরিকা ওয়া শুকরিকা ওয়া হু’সনি ইবাদাতিকা।”
আবু দাউদ ১/২১৩, নাসায়ী, ইবেন হিব্বান, হাদীস সহীহ।

১১. জান্নাত প্রার্থনা করা ও জাহান্নাম থেকে আশ্রয় চাওয়ার দুয়াঃ
اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْجَنَّةَ وَأَعُوذُ بِكَ مِنَ النَّارِ
উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মা ইন্নী আসআলুকাল জান্নাতা ওয়া আ’উযু বিকা মিনান্নার।
অর্থঃ হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে জান্নাত চাই এবং জাহান্নাম থেকে আপনার কাছে আশ্রয় চাই।
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে ৩ বার জান্নাত প্রার্থনা করে, জান্নাত আল্লাহর কাছে দুয়া করে, হে আল্লাহ তাকে জান্নাত দান করো। যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে ৩ বার জাহান্নাম থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে, জাহান্নাম আল্লাহর কাছে দুয়া করে, হে আল্লাহ তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দাও”।
তিরমিযিঃ ২৫৭২, ইবনে মাজাহ ৪৩৪০, শায়খ আলবানি এই হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন, সহীহুল জামি ৬২৭৫।
***উল্লেখ্য – সকাল সন্ধ্যায় ৭ বার “আল্লাহুম্মা আজিরনি মিনান্নার” পড়ার হাদীসটা জয়ীফ বা দুর্বল, শায়খ আলবানী সিলসিলা জয়ীফাহঃ ১৬২৪।
সুতরাং সেটা না পড়ে এই দুয়া পড়বেন, কারণ এটাতে জান্নাত চাওয়া ও জাহান্নাম থেকে মুক্তি চাওয়া দুইটা দোয়া আছে আর এটা সহীহ। ঐটা থেকে এইদুয়াটা ভালো ও সহীহ।

১২. কেয়ামতের দিন হিসাব সহজ করার জন্য দুয়াঃ
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, প্রত্যেকের হিসাব নেওয়া হবে আর আল্লাহ যার হিসাব নেবেন তাকে শাস্তি দেবেন। এই কথা শুনে সাহাবীরা ভয় পেলো, কারণ কে এমন আছে যে নিষ্পাপ? সুতরাং সকলেই শাস্তি পাবে। তখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, মুমিনদের জন্য হিসাব সহজ করা হবে। কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাঁর ঈমানদার বান্দাদেরকে রহমতের চাদরে ঢেকে নেবেন, অন্যদের থেকে আলাদা করে দেবেন। এরপরে গোপনে তাকে তার পাপকাজগুলো দেখানো হবে। বান্দা তার পাপকাজগুলো দেখে ভয় পেয়ে যাবে, আর চিন্তা করতে থাকবে তাহলেতো আমার বাঁচার কোনো পথ নাই! তখন আল্লাহ তাকে বলবেন তুমি পাপ করেছো কিন্তু অমুক সময় তোওবা করেছো আর আমি তোমার তোওবা কবুল করেছি। আর শুধু কবুলই করিনাই – তোওবা করেছো এইজন্য পাপ কাজগুলোকে এখন নেকীতে পরিবর্তন করে দিলাম। এইকথা শুনে বান্দা খুব খুশি হয়ে বলবে, হে আল্লাহ আমারতো আরো অনেক পাপ আছে – সেইগুলোতো দেখতে পাচ্ছিনা (পাপের পরিবর্তে নেকী পাওয়ার আশায় সে এই কথা বলবে)।
এর পরে বান্দাকে তার আমলনামা ডান হাতে দেওয়া হবে। এই হচ্ছে হিসাব সহজ করার পদ্ধতি। এরকম যেন হিসাব গ্রহণ সহজ করা হয়, এই জন্য এই দুয়া করতে হয়ঃ

উচ্চারণঃ আল্লাহুম্ম হা’সিবনি হি’সাবাই-য়্যাসিরা।
অর্থঃ হে আল্লাহ তুমি আমার হিসাব সহজ করো।
ইমাম হাকিম হাদীসটি বর্ণনা করেছেন, শায়খ আলবানীর মতে দুয়াটি হাসান সহীহ।

১৩. ছাত্রদের স্মৃতি শক্তি বাড়ানো, বুদ্ধির প্রখরতা, জিহবার জড়তা বা তোতলামি দূর করার জন্য, ও দাওয়াতী কাজে সাহায্য লাভের জন্য দুয়াঃ
رَبِّ اشْرَحْ لِي صَدْرِي
وَيَسِّرْ لِي أَمْرِي

وَاحْلُلْ عُقْدَةً مِّن لِّسَانِي
يَفْقَهُوا قَوْلِي
উচ্চারণঃ রাব্বিশ-রাহ’লী সাদরী। ওয়া ইয়াসসিরলী আমরী। ওয়াহ’লুল উ’ক্বদাতাম-মিলাসানি। ইয়াফক্বাহু ক্বাওলী।
অর্থঃ হে আমার পালনকর্তা! আমার বক্ষকে প্রশস্ত করে দিন। এবং আমার কাজ সহজ করে দিন। আর আমার জিহবা থেকে জড়তা দূর করে দিন, যাতে করে তারা আমার কথা বুঝতে পারে।
সুরা ত্বা হাঃ

১৪. দুঃখ ও দুশ্চিন্তার সময় পড়ার দো‘আঃ

اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْهَمِّ وَالْحَزَنِ، وَالْعَجْزِ وَالْكَسَلِ، وَالْبُخْلِ وَالْجُبْنِ، وَضَلَعِ الدَّيْنِ وَغَلَبَةِ الرِّجَالِ
আল্লা-হুম্মা ইন্নি আ‘ঊযু বিকা মিনাল হাম্মি ওয়াল হাযানি, ওয়াল ‘আজযি ওয়াল কাসালি, ওয়াল বুখলি ওয়াল জুবনি, ওয়া দালা‘ইদ দ্বাইনে ওয়া গালাবাতির রিজা-লি
হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি দুশ্চিন্তা ও দুঃখ থেকে, অপারগতা ও অলসতা থেকে, কৃপণতা ও ভীরুতা থেকে, ঋণের ভার ও মানুষদের দমন-পীড়ন থেকে।
বুখারী, ৭/১৫৮, নং ২৮৯৩; সেখানে এসেছে, রাসূলুল্লাহ্‌ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দো‘আটি বেশি বেশি করতেন। আরও দেখুন, বুখারী, (ফাতহুল বারীসহ) ১১/১৭৩; আরও দেখুন যা পৃষ্ঠায় ১৩৭ নং এ বর্ণিত হবে।

১৫. দুই সিজদার মাঝখানে বসাঃ
এখানে নিজের পছন্দমতো যেকোনো দুয়া করা যায়না, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যেই দুয়াগুলো করেছেন শুধুমাত্র সেই দুয়াগুলোই করা যাবে। আর এইখানে দুয়া আরবীতেই করতে হবে। দুই সিজদার মাঝখানে এই দুয়াগুলো করার সময় তাশাহুদের মতো আংগুন দিয়ে ইশারা করা সুন্নত। যেই দুয়া করতে হবেঃ ছোট্ট এই দুয়াটা কি মুখস্থ করা যায়না?
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফরয, সুন্নত, নফল যে কোনো সালাতের দুই সিজদার মাঝখানে বসা অবস্থায় এই দুআটি করতেনঃ
رَبِّ اغْفِرْ لِي، رَبِّ اغْفِرْ لِي
উচ্চারণঃ রাব্বিগ ফিরলি, রাব্বিগ ফিরলি।
অর্থঃ হে আমার রব আমাকে ক্ষমা করা, হে আমার রব আমাকে ক্ষমা কর।
আবু দাউদ ১/৩১, ইবনে মাজাহ, দুয়াটা সহীহ।
এই ছোট্ট দুয়াটা পড়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ মিস করা ঠিকনা। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দিনে ৭০ থেকে ১০০ বার তোওবা করতেন। আপনি যদি সালাতের দুই সিজদার মাঝখানে এই দুয়াটা পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলেন তাহলে দিনে যত রাকাত করে সালাত পড়বেন, তত বারই আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া হবে। আল্লাহর ভালোবাসা পাওয়ার একটা উপায় হচ্ছে বেশি বেশি করে নিয়মিত তোওবা ও ইস্তিগফার করা (ক্ষমা চাওয়ার দুয়া করা)। এছাড়া দুই সিজদার মাঝখানে আরেকটা ছোট্ট সুন্দর দুয়াঃ
اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي، وَارْحَمْنِي، وَاهْدِنِي، وَاجْبُرْنِي، وَعَافِنِي، وَارْزُقْنِي، وَارْفَعْنِي
উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মাগফিরলী, ওয়ারহা’মনী, ওয়াহদিনী, ওয়াজবুরনী, ওয়াআ’ফিনি, ওয়ারযুক্বনী, ওয়ারফা‘নী।
অর্থঃ হে আল্লাহ! আপনি আমাকে ক্ষমা করুন, আমার প্রতি দয়া করুন, আমাকে সঠিক পথে পরিচালিত করুন, আমার সমস্ত ক্ষয়ক্ষতি পূরণ করে দিন, আমাকে নিরাপত্তা দান করুন, আমাকে রিযিক দান করুন এবং আমার মর্যাদা বৃদ্ধি করুন”।
হাদীসটি ইমাম নাসাঈ ব্যতীত সুনান গ্রন্থগারগণ সবাই সংকলন করেছেন। আবূ দাউদঃ ৮৫০, তিরমিযীঃ ২৮৪, ২৮৫, ইবন মাজাহঃ ৮৯৮। শায়খ আলবানির মতে হাদীস সহীহ।
বিঃদ্রঃ এই দুয়াটা কম-বেশি বিভিন্ন ভাবে বর্ণনা আছে, সবগুলো সহীহ – তবে এখানে যেটা দেওয়া আছে এটা সবচাইতে বড় যেখানে সবগুলো দুয়া একসাথে আছে। এটা করলে সবগুলো দুয়াই করা হলো।

১৬. নেককার স্বামী/স্ত্রী ও সন্তানের জন্য দুয়াঃ

رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
উচ্চারণঃ রব্বানা হাবলানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা ক্বুররাতা আ’ইয়ুন, ওয়াজআ’লনা মুত্তাক্বীনা ইমামা।
অর্থঃ হে আমাদের পালনকর্তা, আমাদের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে এবং আমাদের সন্তানের পক্ষ থেকে আমাদের জন্যে চোখের শীতলতা দান কর এবং আমাদেরকে মুত্তাকীদের জন্যে আদর্শস্বরূপ কর।

দিনে রাতে যে কোনো সময় আমল করার জন্য এই বইয়ের সবগুলো দুয়াই সহীহ, আর দাম মাত্র ৫০ টাকা। ছোট্ট এই বইটা পকেটে রেখে দেওয়া যায়, রাস্তায়, জার্নিতে, বাস স্ট্যান্ডে অপেক্ষায় বা যে কোনো অবসব সময়ে বের করে দুয়াগুলো শিখে বা পড়ে সময়টা নষ্ট না করে কাজে লাগানোর জন্য।
বিঃদ্রঃ - যারা অলসতা বশত বা ইমানের দুর্বলতার কারণে আরবী মুখস্থ করতে চান না বা পারেন না, তারা অন্তত বাংলাটা মুখস্থ করে রাখতে পারেন এবং মুনাজাতের সময় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শেখানো গুরুত্বপূর্ণ এই জিনিসগুলো আল্লাহর কাছে চাইতে পারেন।
وَصَلَّى اللَّهُ وَسَلَّمَ وَبَارَكَ عَلَى نَبِيِّنَا مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِهِ وَأَصْحَابِهِ أَجْمَعِينَ.
আল্লাহ্ দরূদ ও সালাম এবং বরকত বর্ষণ করুন আমাদের নবী মুহাম্মাদ, তাঁর বংশধর ও তাঁর সকল সাহাবীগণের উপর।

Wednesday, April 20, 2016

হাশরের ময়দানে ৫টি প্রশ্

হাশরের ময়দানে ৫টি প্রশ্নঃ
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ
কিয়ামতের দিন (হাশরের ময়দানে) বান্দা তার স্থানেই দাঁড়িয়ে থাকবে, যে পর্যন্ত না তাকে জিজ্ঞেস করা হবেঃ
১. তার জীবনকাল কিভাবে কাটিয়েছে,
২. তার জ্ঞান কি কাজে লাগিয়েছে,
৩. তার সম্পদ কোথা থেকে অর্জন করেছে,
৪. তার সম্পদ কোথায় খরচ করেছে এবং
৫. তার শরীর কিভাবে পুরানো করেছে?
[ইমাম তিরমিযীঃ ২৪১৭, হাদীসটি হাসান ও সহীহ]

Tuesday, April 19, 2016

কি ঘটেছিল কারবালার প্রান্তরে?

কি ঘটেছিল কারবালার প্রান্তরে?
যুগ যুগ ধরে প্রচার হয়ে আসা মিথ্যা কাহিনীটাই আমরা জানি, সত্যটা জানা দরকার।
লিখেছেনঃ শায়খ আব্দুল্লাহ শাহেদ আল-মাদানী।
_________________________
১০ই মুহাররম বা আশুরার দিন। এ দিনটি বিভিন্ন কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ন। কিন্তু সেই বিভিন্ন কারণ বাদ দিয়ে যে উপলক্ষ্যে আমরা ছুটি কাটাই, তা হল কারবালার ঘটনা। শেষ নবী ও রসুল মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নাতি ইমাম হুসাইন ইবনে আলী (রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু) এদিন কারবালাতে মুসলিম নামধারী কিছু মুনাফিকের হাতে শহীদ হন। তিনি অত্যন্ত সৎ, সজ্জন এবং সাহসী সাহাবা ছিলেন। রসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পরে তিনিও আমাদের খুব প্রিয় একজন নেতা। কিন্তু ইসলামের অন্যান্য অনেক বিষয়ের মত তার মৃত্যু সম্পর্কে সত্য ইতিহাসটা আমরা জানি না, জানার চেষ্টাও করি না।
আসলে কি হয়েছিল?
৬০ হিজরির ঘটনা। ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়াকে খলিফা নিযুক্ত করেন তার বাবা মুআবিয়া (রাঃ), কিন্তু এটা ইসলামের মর্মের চেয়ে রাজতান্ত্রিক ধারায় বেশী প্রভাবিত ছিল। তাই তার হাতে বায়াত করেননি হুসাইন (রাঃ), ইরাকের লোকেরা এ খবর পেয়ে তার কাছে চিঠি/দূত পাঠিয়ে জানাল তারা তাকে খলিফা হিসেবে চায়, ইয়াজিদকে নয়। সমর্থকদের চিঠি পেয়ে হুসাইন (রাঃ) তাঁর চাচাতো ভাই মুসলিম বিন আকীলকে কুফায় পাঠালেন, সেখানকার অবস্থা দেখার জন্য। মুসলিম দেখলেন যে আসলেই অনেক মানুষ হুসাইনকে (রাঃ) কে খলিফা হিসেবে চাচ্ছে। তিনি হুসাইন (রাঃ) কে সেটা জানিয়েও দিলেন। ইতমধ্যে কিছু অত্যুৎসাহী লোকেরা হানী বিন উরওয়ার ঘরে মুসলিমের হাতে হুসাইনের পক্ষে বায়াত নেওয়া শুরু করল। সিরিয়াতে ইয়াজিদের কাছে এ খবর পৌছালে সে বসরার গভর্নর উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদকে পাঠাল কুফাবাসীর বিদ্রোহ দমন করতে।
উবাইদুল্লাহ কুফায় গিয়ে দেখে ঘটনা সত্যি। মুসলিম বিন আকীল চার হাজার সমর্থক নিয়ে উবাইদুল্লাহ বিন জিয়াদের প্রাসাদ ঘেরাও করলেন। এ সময় উবাইদুল্লাহ দাঁড়িয়ে এক ভাষণ দিয়ে মানুষকে ইয়াজিদের সেনা বাহিনীর ভয় দেখাল। কুফাবাসীরা ইয়াজিদের শাস্তির ভয়ে আস্তে আস্তে সরে পড়তে লাগল। সূর্য অস্ত যাওয়ার পর মুসলিম বিন আকীল দেখলেন, তথাকথিত হুসাইন সমর্থকদের কেউই অবশিষ্ট নেই। তাকে গ্রেপ্তার করে হত্যার আদেশ দিল উবাইদুল্লাহ। মুসলিম মৃত্যুর আগে হুসাইনের কাছে একটি চিঠি পাঠান
হুসাইন! পরিবার-পরিজন নিয়ে ফেরত যাও। কুফা বাসীদের ধোঁকায় পড়ো না। কেননা তারা তোমার সাথে মিথ্যা বলেছে। আমার সাথেও তারা সত্য বলেনি।
এদিকে মুসলিম বিন আকীলের মৃত্যু হলেও তার প্রথম চিঠির উপর ভিত্তি করে যুলহিজ্জা মাসের ৮ তারিখে হুসাইন (রাঃ) মক্কা থেকে কুফার উদ্দেশ্যে রওনা দেন। অনেক সাহাবী তাকে বের হতে নিষেধ করেছিলেন। তাদের মধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস, আব্দুল্লাহ ইবনে উমর, আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর, আব্দুল্লাহ বিন আমর এবং হুসাইন (রাঃ) এর ভাই মুহাম্মাদ ইবনুল হানাফীয়ার নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
সুফীয়ান আস সাওরী ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে সহীহ সূত্রে বর্ণনা করেন যে, ইবনে আব্বাস (রাঃ) হুসাইনকে বলেছিলেন, মানুষের দোষারোপের ভয় না থাকলে, আমি তোমার ঘাড়ে ধরে তোমাকে কুফাতের যাওয়া থেকে ফিরিয়ে রাখতাম।
আব্দুল্লাহ ইবনে যুবাইর (রাঃ) হুসাইনকে বলেন, হুসাইন! কোথায় যাও? এমন লোকদের কাছে, যারা তোমার পিতাকে হত্যা করেছে এবং তোমার ভাইকে আঘাত করেছে?
যাত্রা পথে হুসাইনের কাছে মুসলিমের সেই চিঠি এসে পৌঁছল। চিঠি পড়ে তিনি কুফার পথ পরিহার করে ইয়াজিদের কাছে যাওয়ার জন্য সিরিয়ার পথে অগ্রসর হতে থাকলেন। পথিমধ্যে ইয়াজিদের সৈন্যরা আমর বিন সাদ, সীমার বিন যুল জাওশান এবং হুসাইন বিন তামীমের নেতৃত্বে কারবালার প্রান্তরে হুসাইনের (রাঃ) গতিরোধ করল। তিনি আগত সৈন্যদলকে আল্লাহর দোহাই এবং নিজের মর্যাদার কথা উল্লেখ করে তিনটি প্রস্তাব দেন
১. তাকে ইয়াজিদের দরবারে যেতে দেয়া হোক। তিনি সেখানে গিয়ে ইয়াজিদের হাতে বায়াত গ্রহণ করবেন। কেননা তিনি জানতেন যে, ইয়াজিদ তাঁকে হত্যা করতে চান না।
২. অথবা তাঁকে মদিনায় ফেরত যেতে দেয়া হোক।
৩. অথবা তাঁকে কোন ইসলামী অঞ্চলের সীমান্তের দিকে চলে যেতে দেয়া হোক। সেখানে তিনি জিহাদ করবেন এবং ইসলামী রাজ্যের সীমানা পাহারা দেবেন।
ইয়াজিদের সৈন্যরা উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদের ফয়সালা ছাড়া কোন প্রস্তাবই মানতে রাজী হল না। এ কথা শুনে উবাইদুল্লাহর এক সেনাপতি হুর বিন ইয়াজিদ বললেন, এরা তোমাদের কাছে যেই প্রস্তাব পেশ করছে তা কি তোমরা মানবে না? আল্লাহর কসম! তুর্কী এবং দায়লামের লোকেরাও যদি তোমাদের কাছে এই প্রার্থনাটি করত, তাহলে তা ফেরত দেয়া তোমাদের জন্য বৈধ হত না।
এরপরও তারা হুসাইন (রাঃ) এর অত্যন্ত যৌক্তিক এই প্রস্তাবগুলো মেনে নেয়নি। সেই সেনাপতি ঘোড়া নিয়ে সেখান থেকে চলে আসলেন হুসাইন (রাঃ) ও তাঁর সাথীদের সালাম দিয়ে উবাইদুল্লাহ এর সৈনিকদের সাথে হুসাইনের পক্ষে যুদ্ধ করে নিহত হলেন।
সৈন্য সংখ্যার দিক থেকে হুসাইনের সাথী ও ইয়াজিদের সৈনিকদের মধ্যে বিশাল পার্থক্য ছিল। হুসাইনের (রাঃ) এর সাথে ছিলেন
১. আলী (রাঃ) এর ছেলেরা - আবু বকর, মুহাম্মাদ, উসমান, জাফর এবং আব্বাস।
২. হুসাইনের (রাঃ) নিজের সন্তানেরা - আবু বকর, উমর, উসমান, আলী আকবার এবং আব্দুল্লাহ।
৩. হাসান (রাঃ) এর ছেলেদের মধ্যে থেকে - আবু বকর, উমর, আব্দুল্লাহ এবং কাসেম।
৪. আকীলের সন্তানদের মধ্যে হতে - জাফর, আব্দুর রাহমান এবং আব্দুল্লাহ বিন মুসলিম বিন আকীল।
৫. আব্দুল্লাহ বিন জাফরের সন্তানদের মধ্যে হতে - আউন এবং আব্দুল্লাহ।
সাহাবা এবং তাবেঈদের এই ছোট্ট দলটির সবাই বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে নিহত হন। অবশেষে হুসাইন (রাঃ) ছাড়া আর কেউ জীবিত রইলেন না। সীমার বিন যুল জাওশান নামের এক নরপশু বর্শা দিয়ে হুসাইনের (রাঃ) শরীরে আঘাত করে ধরাশায়ী করে ফেলল। শেষে ইয়াজিদ বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণে নির্ভীক এই বীর আল্লাহর লিখে রাখা ভাগ্যানুযায়ী শহীদ হলেন, ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। হুসাইন (রাঃ) অন্যায় কিছু বলেন নি, অন্যায় কিছু করেন নি। তার হত্যাকারী ও হত্যায় সাহায্যকারীদের আল্লাহর ক্রোধ ঘেরাও করুক, এরা ধ্বংস হোক! আল্লাহ্ তায়ালা শহীদ হুসাইন (রাঃ) এবং তাঁর সাথীদেরকে স্বীয় রহমত ও সন্তুষ্টি দ্বারা আচ্ছাদিত করুন।
এ ঘটনা মুসলিম জাতির ইতিহাসের একটি লজ্জাজনক অধ্যায় যা বিশ্বাসঘাতক কুফাবাসী আমাদের উপহার দিয়েছে। এরপরে তারা এতে রঙ মাখিয়ে গল্প বানিয়েছে - পাথর উল্টালে রক্ত বের হওয়া, সূর্যগ্রহণ, আকাশের দিগন্ত লাল হওয়া, আকাশ থেকে পাথর পড়া ইত্যাদি। আল্লাহ যদি চাইতেন তিনি এইসব আজগুবি ঘটনা না ঘটিয়েই হুসাইন (রাঃ) ও তার সঙ্গীদের রক্ষা করতে পারতেন।
হুসাইন (রাঃ) এর হত্যাকারী কে?
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইম্যিয়া (রহঃ) বলেন,
সকল মুহাদ্দিস ও ঐতিহাসিকের ঐক্যমতে ইয়াজিদ বিন মুয়াবিয়া হুসাইনকে (রাঃ) হত্যা করার আদেশ দেয়নি। বরং, উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদকে ইরাকে হুসাইনকে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে বাঁধা দিতে বলেছিল। এতটুকুই ছিল তার ভূমিকা। বিশুদ্ধ মতে তার কাছে যখন হুসাইন (রাঃ) নিহত হওয়ার খবর পৌঁছলে সে আফসোস করেছিল। সে হুসাইন (রাঃ) পরিবারের কোন মহিলাকে বন্দী বা দাসীতে পরিণত করেনি; বরং পরিবারের জীবিত সকল সদস্যকে সসম্মানে মদিনায় পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিল।
ইবনে আবী নুম হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন, আমি একদা আব্দুল্লাহ ইবনে উমরের নিকট উপস্থিত ছিলাম। তখন একজন লোক তাঁকে মশা মারার বিধান জানতে চাইল। তিনি তখন লোকটিকে জিজ্ঞেস করলেন: তুমি কোন দেশের লোক? সে বলল, ইরাকের। ইবনে উমর (রাঃ) তখন উপস্থিত লোকদেরকে লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা এই লোকটির প্রতি লক্ষ্য কর। সে আমাকে মশা মারার হুকুম জিজ্ঞেস করছে, অথচ তারা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নাতি (হুসাইন রাঃ কে) হত্যা করেছে। আর আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, এরা দুজন (হাসান ও হুসাইন) আমার দুনিয়ার দুটি ফুল।
সহীহুল বুখারী, হাদীছ নং- ৫৯৯৪।
হুসাইন (রাঃ) নিহত হওয়ার পূর্বে ইরাকবাসীদের বলেন,
তোমরা কি চিঠির মাধ্যমে আমাকে এখানে আসতে আহবান করো নি? আমাকে সাহায্য করার ওয়াদা করো নি? অকল্যাণ হোক তোমাদের! যেই অস্ত্র দিয়ে আমরা ও তোমরা মিলে ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি এখন সেই অস্ত্র তোমরা আমাদের বিরুদ্ধে চালাতে যাচ্ছ? মাছি যেমন উড়ে যায় তেমনি তোমরা আমার পক্ষে কৃত বায়াত থেকে সড়ে যাচ্ছ, সকল ওয়াদা-অঙ্গীকার ভঙ্গ করেছ। ধ্বংস হোক এই উম্মতের তাগুতের দলেরা।
হুসাইন (রাঃ)  তাঁর পূর্বের সমর্থকদের বিরুদ্ধে একটি বদ দুআও করেন,
হে আল্লাহ! আপনি যদি তাদের হায়াত দীর্ঘ করেন, তাহলে তাদের দলের মাঝে বিভক্তি সৃষ্টি করে দিন। তাদেরকে দলে দলে বিচ্ছিন্ন করে দিন। তাদের শাসকদেরকে তাদের উপর কখনই সন্তুষ্ট করবেন না। তারা আমাদেরকে সাহায্য করবে বলে ডেকে এনেছে। অতঃপর আমাদেরকে হত্যা করার জন্য উদ্যত হয়েছে।
হুসাইনের (রাঃ) এই দুয়া প্রমাণ করে যে, ইয়াজিদ প্রত্যক্ষভাবে হুসাইনের (রাঃ) হত্যায় জড়িত ছিল না। কেননা তিনি দুআয় বলেছেন, হে আল্লাহ! আপনি তাদের শাসকদেরকে তাদের উপর কখনই সন্তুষ্ট করবেন না।
এ থেকে বুঝা যাচ্ছে যে, ইরাকবাসী শিয়ারা উমাইয়া শাসকদের সন্তুষ্টি অর্জনের আশায় হুসাইনের (রাঃ) এর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলো। তবে আল্লাহ সুবহানাহু তাআলা হুসাইন (রাঃ) এর দুআ কবুল করে নেন। পরবর্তীতে উবাইদুল্লাহ বিন যিয়াদকেও ইয়াজিদের আদেশে হত্যা করা হয়েছিলো।
আমাদের করণীয়ঃ
আমাদের সালফে সালেহীনরা (এই উম্মতের পূর্ববর্তী নেককার লোকদের) কেউই ইয়াজিদের নামের শেষে রাহিমাহুল্লাহ বা লানাতুল্লাহ আলাই - এ দুইটি বাক্যের কোনটিই উল্লেখ করেন নি। অর্থাৎ, কেউ তাকে ধ্বংস হওয়ার জন্যে বদদুয়া বা তার জন্যে রহমতের দুয়া কোনটাই করেন নি। সুতরাং সে যেহেতু তার আমল নিয়ে চলে গেছে, তাই তার ব্যাপারে আমাদের চুপ থাকাই ভাল। তার ভাল মন্দ আমলের হিসাব সে দেবে, আমাদেরটা আমরা। আমরা ইয়াজীদকে গালি দেব না, তবে রাকে ভালবাসার প্রশ্ন তো ওঠেই না। তার চেয়ে হুসাইন (রাঃ) ইমামাতের অনেক বেশি যোগ্য ছিলেন, বহু গুণে শ্রেষ্ঠ মানুষ ছিলেন, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কিন্তু আল্লাহ যাকে খুশি তাকে রাজত্ব দেন, এটাই আল্লাহর রুবুবিয়াত।
কোন ধরণের জন্ম-মৃত্যু বার্ষিকী পালনের প্রথা ইসলামে নেই। মুসলিম হিসেবে আমাদের রসুলুল্লাহ সাল্লালাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম শিক্ষা দিয়েছেন, মৃত বা শহীদ ব্যক্তির জন্য বিলাপ না করা, আনুষ্ঠানিকভাবে তিন দিনের বেশি শোক প্রকাশ না করা। তিনি বলেছেন,
মৃত ব্যক্তির উপর বিলাপকারী যদি তওবা না করে মারা যায়, তাকে কিয়ামতের দিন লোহার কাঁটাযুক্ত জামা পড়ানো হবে এবং আলকাতরার প্রলেপ লাগানো পায়জামা পড়ানো হবে।
সহীহ মুসলিম।
যে কোন বিপদে আমাদের কর্তব্য কুরআনের সেই বাণী স্মরণ করা,
যখন তাঁরা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে, নিশ্চয়ই আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তারই সান্নিধ্যে ফিরে যাবো।
সুরা বাকারাঃ ১৫৬।
রসুলের সুন্নাত ভালবাসলে আমাদের উচিত এই দিনে সিয়াম পালন করা। আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন: নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মদিনায় কিছু ইহুদীদের আশুরার দিন রোজা রাখতে দেখে জিজ্ঞেস করলেন, এটি কিসের রোজা? তারা উত্তর দিল, এটি একটি পবিত্র দিন। এই দিনে আল্লাহ বনী ইসরাইলকে তাদের শত্রুদের কবল থেকে পরিত্রাণ দিয়েছেন। তাই মুসা (আঃ) এ দিন রোজা রেখেছেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বললেন, তাদের চাইতে মুসা (আঃ) এর সাথে আমার সম্পর্ক অধিক। সুতরাং তিনি (আশুরার দিনে) সিয়াম থাকলেন এবং সাহাবীদেরকে সিয়াম রাখার আদেশ দিয়েছেন। (সহীহ বুখারী)
অপর বর্ণনায় তিনি আগামী বছর নয় তারিখেও সিয়াম থাকার নিয়ত করেছিলেন।

আল্লাহ আমাদের সত্যটা জেনে, সস্তা আবেগ ছেড়ে সঠিক আমল করার তৌফিক দিন। আমিন।