Tuesday, January 13, 2015

নামাযের ফযীলতের ২৫টি সুসংবাদ


কুরআনও সহীহ হাদীসের আলোকে নামাযের ফযীলত সম্পর্কে ২৫টি সুসংবাদঃ

ছালাত সর্বোত্তম আমল: 
রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)কে প্রশ্ন করা হল কোন আমলটি সর্বোত্তম? তিনি বললেন, সময়মত ছালাত আদায় করা। (মুসলিম)

ছালাত বান্দা এবং প্রভুর মাঝে সম্পর্কের মাধ্যম: 
রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, 
তোমাদের কেউ যখন ছালাত আদায় করে, তখন সে তার পালনকর্তার সাথে গোপনে কথা বলে। (বুখারী)

ছালাত দ্বীনের মূল খুঁটি: 
রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, 
সবকিছুর মূল হচ্ছে ইসলাম। তার (ইসলামের) মূল স্তম্ভ হচ্ছে ছালাত এবং তার (ইসলামের) সর্বোচ্চ চুড়া হচ্ছে জিহাদ। (তিরমিযী)

ছালাত হচ্ছে আলোকবর্তিকা: 
রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, 
ছালাত হচ্ছে (কিয়ামতের দিন বান্দার জন্য) নূর বা আলোকবর্তিকা। (মুসলিম, তিরমিযী)

মুনাফেকী থেকে মুক্তি লাভের মাধ্যম হচ্ছে ছালাতঃ 
রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, 
মুনাফেকদের উপর ফজর ও এশা ছালাতের চাইতে অধিক ভারী কোন ছালাত নেই। তারা যদি জানত এ দু‘ছালাতে কত ছওয়াব রয়েছে, তবে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও তাতে উপস্থিত হত। (বুখারী ও মুসলিম)

ছালাত জাহান্নাম থেকে নিরাপত্তার গ্যারান্টি: 
রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, 
কখনই জাহান্নামে প্রবেশ করবে না এমন ব্যক্তি, যে সূর্যোদয়ের পূর্বে ছালাত আদায় করেছে এবং সূর্যাস্তের-র পূর্বে ছালাত আদায় করেছে। অর্থাৎ- ফজর ও আছর ছালাত। (মুসলিম)

নিশ্চয় ছালাত মানুষকে অশ্লীল ও গর্হিত কাজ থেকে বিরত রাখে: 
আল্লাহ্‌ তা‘আলা বলেন, 

اتْلُ مَا أُوحِيَ إِلَيْكَ مِنْ الْكِتَابِ وَأَقِمْ الصَّلَاةَ إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَى عَنْ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنْكَرِ
কুরআনের যা আপনার কাছে ওহী করা হয়েছে তা পাঠ করুন এবং ছালাত প্রতিষ্ঠা করুন। নিশ্চয় ছালাত অশ্লীল ও গর্হিত বিষয় থেকে বিরত রাখে। (সূরা আনকাবূত- ৪৫)

সকল কাজে সাহায্য লাভের মাধ্যম ছালাত: 
আল্লাহ্‌ বলেন, 
وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ 
তোমরা ছবর (ধৈর্য) এবং ছালাতের মাধ্যমে (আল্লাহ্‌র কাছে) সাহায্য প্রার্থনা কর। (সূরা বাক্বারা- ৪৫)

একাকী ছালাত আদায় করার চেয়ে জামাতে আদায় করা অনেক উত্তম: 
রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, 
একাকী ছালাত আদায় করার চেয়ে জামাতের সাথে ছালাত আদায় করা পঁচিশ গুণ বেশী মর্যাদা সম্পন্ন। (বুখারী ও মুসলিম)

ফেরেশতারা মুছল্লীর জন্য মাগফেরাত ও রহমতের দুয়া করেন: 
রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, 
তোমাদের কোন ব্যক্তি ছালাত আদায় করার পর যতক্ষণ স্বীয় জায়নামাজে বসে থাকে ততক্ষণ ওযু ভঙ্গ না হওয়া পর্যন্ত ফেরেশতারা তার জন্য দু‘আ করতে থাকে। বলে, হে আল্লাহ্‌ তাকে ক্ষমা কর, তাকে রহম কর। (বুখারী ও মুসলিম)

ছালাত গুনাহ্‌ মাফের মাধ্যম: 
রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, 
যে ব্যক্তি ছালাতের জন্য ওযু করবে এবং ওযুকে পরি পূর্ণরূপে করবে। তারপর ফরয ছালাত আদায় করার জন্য পথ চলবে; অতঃপর তা মানুষের সাথে বা জামাতে বা মসজিদে আদায় করবে, তাহলে আল্লাহ্‌ তার গুনাহ্‌ সমূহ ক্ষমা করে দিবেন। (মুসলিম)

ছালাতের মাধ্যমে শরীর থেকে গুনাহ‌গুলো বের হয়ে যায়: 
রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, 
তোমরা কি মনে কর, তোমাদের কারো ঘরের সামনে যদি একটি নদী প্রবাহিত থাকে। এবং প্রতিদিন সে উহাতে পাঁচ বার গোসল করে, তবে তার শরীরে কোন ময়লা থাকবে কি? তাঁরা (সাহাবিগণ) বললেন: কোন ময়লাই বাকী থাকতে পারে না। তিনি বললেন: এরূপ উদাহরণ হল পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতের ক্ষেত্রেও। এভাবে ছালাতের বিনিময়ে আল্লাহ্‌ নামাযীর যাবতীয় (ছোট) পাপগুলো মোচন করে দেন। (বুখারী ও মুসলিম)

ছালাতের জন্য মসজিদে গমন করলে এক পদে গুনাহ মোচন হয় অন্য পদে মর্যাদা উন্নীত হয়:
রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, 
যে ব্যক্তি নিজ গৃহে ওযুর মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জন করে, তারপর আল্লাহ্‌র কোন এক ঘরে (মসজিদে) যায় আল্লাহ্‌র কোন একটি ফরজ ছালাত আদায় করার জন্য, তবে তার পদক্ষেপগুলোর বিনিময়ে একটি পদে একটি গুনাহ মোচন করা হয় অন্য পদে একটি মর্যাদা উন্নীত হয়। (মুসলিম)

আগেভাগে ছালাতে আসার মর্যাদা: 
রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, 
মানুষ যদি জানত আজান দেয়া এবং প্রথম কাতারে ছালাত আদায় করার প্রতিদান কি, তাহলে (কে আজান দেবে বা কে প্রথম কাতারে ছালাত আদায় করবে তা নির্ধারণ করার জন্য) তারা পরস্পর লটারি করতে বাধ্য হত। তারা যদি জানত আগেভাগে ছালাতে আসাতে কি প্রতিদান রয়েছে তবে, তারা প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ত। (বুখারী ও মুসলিম)

ছালাতের জন্য অপেক্ষাকারী ছালাতরতই থাকে: 
রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, 
তোমাদের কোন ব্যক্তি ছালারতই থাকে যতক্ষণ ছালাত তাকে বাধা দিয়ে রাখে। শুধু ছালাতই তাকে নিজ গৃহে বা পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়া থেকে বিরত রাখে। (বুখারী ও মুসলিম)

ছালাতে আমীন বলার দ্বারা পূর্বের গুনাহ্‌ ক্ষমা হয়ে যায়: 
রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, 
তোমাদের কোন ব্যক্তি যখন (সূরা ফাতিহা শেষে) ‘আমীন’ বলে। আর ফেরেশতারা আসমানে বলে ‘আমীন’। তাদের একজনের আমীন বলা অন্য জনের সাথে মিলে গেলে তার পূর্বের গুনাহ্‌ ক্ষমা হয়ে যায়। (বুখারী ও মুসলিম)

ছালাতের মাধ্যমে আল্লাহ্‌র নিরাপত্তা লাভ করা যায়: 
রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, 
যে ব্যক্তি সকালের (ফজর) ছালাত আদায় করে সে আল্লাহ্‌র জিম্মাদারিতে হয়ে যায়। ভেবে দেখ হে আদম সন্তান! আল্লাহ্‌ যেন তার জিম্মাদারিতে তোমার কাছে কোন কিছু চেয়ে না বসেন। (মুসলিম)

ছালাতের দ্বারা কিয়ামত দিবসে পরিপূর্ণ নূর লাভ করা যায়: 
রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, 
যারা অন্ধকারে (অর্থাৎ- ফজরের ছালাত আদায় করার জন্য) মসজিদে গমন করে, তাদেরকে কিয়ামত দিবসে পরিপূর্ণ নূরের সুসংবাদ দিয়ে দাও। (আবূ দাঊদ, তিরমিযী)

আছর ও ফজরের ছালাত আদায়কারীর জন্য জান্নাতের সুসংবাদ: 
রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, 
যে ব্যক্তি দুঠান্ডার সময়ের (আছর ও ফজর) ছালাত আদায় করবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। (বুখারী ও মুসলিম)

পুলসিরাত পার হয়ে জান্নাতে যাওয়ার সুসংবাদ: 
রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, 
প্রত্যেক পরহেজগার ব্যক্তির গৃহ হচ্ছে মসজিদ। আর যে ব্যক্তির গৃহ হবে মসজিদ আল্লাহ্‌ তার জন্য করুণা ও দয়ার জিম্মাদার হয়ে যান এবং আরও জিম্মাদারি নেন পুলসিরাত পার হয়ে আল্লাহ্‌র সন’ষ্টি জান্নাতে যাওয়ার। (ত্ববরানী, শায়খ আলবানী হাদছীটিকে ছহীহ বলেছেন।)

ছালাত শয়তান থেকে নিরাপদ থাকার মাধ্যম: 
রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, 
কোন গ্রামে যদি তিনজন লোক থাকে এবং তারা জামাতের সাথে ছালাত প্রতিষ্ঠা না করে তবে শয়তান তাদের উপর প্রাধান্য বিস্তার করে। সুতরাং তোমরা জামাত বদ্ধ থাক। কেননা দুল ছুট একক ছাগলকে নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলে। (আহমাদ, আবু দাউদ, নাসাঈ, দ্র: ছহীহুল জামে হা/ ৫৭০১)

ছালাত আদায়কারীর জন্য ফেরেশতারা সাক্ষ্য দান ককরে:
রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, 
রাতে একদল ফেরেশতা এবং দিনে একদল ফেরেশতা তোমাদের নিকট আআগমনকরে। তারা ফজর ছালাত এবং আছর ছালাতে পরস্পর মিলিত হয়। তারপর যেসকল ফেরেশতা রাতে তোমাদের নিকট আআগমনকরেছিল তারা চলে যায়, তখন আল্লাহ্‌ তাদেরকে জিজ্ঞেস করেন- অথচ তিনি সর্বাধিক জানেন- আমার বান্দাদেরকে কি অবস্থায় ছেড়ে এসেছ? তারা বলে, তাদেরকে রেখে এসেছি এমন অবস্থায় যে তারা ছালাত আদায় করছে এবং তাদেরকে এমন অবস্থায় আমরা পেয়েছি যে তারা ছালাত আদায় করছে। অন্য বর্ণনায় আছে, আমরা যখন তাদের কাছে যাই তখন তারা ছালাতরত ছিল এবং যখন তাদেরকে ছেড়ে আসি তখনও তারা ছালাতরত ছিল। সুতরাং তাদেরকে হিসাবের দিন ক্ষমা করুন। (বুখারী ও মুসলিম, দ্র: ছহীহ্‌ তারগীব ও তারহীব হা/৪৬৩)

পূর্ণ রাত নফল ছালাত আদায় করার ছওয়াব: 
রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, 
যে ব্যক্তি এশা ছালাত জামাতের সাথে আদায় করবে, সে যেন অর্ধ রাত্রি নফল ছালাত আদায় করল, এবং যে ব্যক্তি ফজর ছালাত জামাতের সাথে আদায় করবে, সে যেন পূর্ণ রাত্রি নফল ছালাত আদায় করল। (মুসলিম)

ছালাতই কিয়ামত দিবসে আরশের নীচে ছায়া লাভের মাধ্যম: 
রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, 
কিয়ামত দিবসে সাত ধরণের ব্যক্তিকে আরশের নীচে ছায়া দান করা হবে যে দিন আল্লাহ্‌র আরশের ছায়া ব্যতীত কোন ছায়া থাকবে না- তাদের মধ্যে একজন হচ্ছে এমন ব্যক্তি যার হৃদয় লটকানো থাকে মসজিদে। অর্থাৎ যখনই ছালাতের সময় হয় সে ছুটে যায় মসজিদের পানে। (বুখারী ও মুসলিম)

মুনাফেকী এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ: 
রাসূলুল্লাহ্‌ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, 
যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌র জন্য চল্লিশ দিন (২০০ ওয়াক্ত) জামাতের সাথে ইমামের তাকবীরে তাহরীমার সাথে ছালাত আদায় করবে তার জন্য দু‘টি মুক্তি নামা লিখা হবে। 
১) জাহান্নাম থেকে মুক্তি এবং 
২) মুনাফেক্বী থেকে মুক্তি। (তিরমিযী, দ্র: ছহীহুল জামে হা/৬৩৬৫)

Monday, January 12, 2015

বিভিন্ন যানবাহনে নামায

বিভিন্ন যানবাহনে নামায
==================
মহানবী (সাঃ) সওয়ারীর উপর ফরয নামায পড়তেন না। ফরয নামাযের সময় হলে তিনি উট থেকে নেমে মাটিতে দাঁড়াতেন।
সুতরাং সফরে (মোটর গাড়ি, গরুর গাড়ি, উট,হাতি, ঘোড়া প্রভৃতি) যানবাহনে নামাযের সময় হলে যানবাহন থামিয়ে নামায পড়তে হবে। কিন্তু যে যানবাহনে থামার বা নামার সুযোগ নেই, অথচ সেখানে যথানিয়মে পূর্ণরুপে নামায আদায় সম্ভব, সে যানবাহনে যথা সময়ে নামায পড়তে হবে। পরন্তু সেখানে যদি যথানিয়মে পূর্ণরুপে নামায আদায় করার সুযোগ না থাকে, তাহলে গন্তব্যস্থল পৌঁছনোর আগেই নামাযের সময় অতিবাহিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে সে যানবাহনের উপরেই যথাসময়ে নামায পড়ে নেওয়া জরুরী। (আহ্‌কামুল ইমামাতি অল-ই’তিমামি ফিস সালাত, আব্দুল মুহ্‌সিন আল-মুনীফ ৪০১নং)
অতএব প্লেন, ট্রেন, বাস প্রভৃতি যানবাহনের ভিতরে জামাআত সহকারে নামায সম্ভব হলে জামাআত সহকারেই পড়তে হবে। [প্লেনে একাধিক ফাঁকা জায়গা আছে; যেখানে জামাআত করে নামায পড়া সম্ভব। ]
নচেৎ একাকী নিজ নিজ সিটে বসে সময় পার হওয়ার আগে আগেই নামায পড়ে নিতে হবে। না পড়লে এবং পরে কাযা পড়লেও গুনাহগার হতে হবে।
যথাসম্ভব কিবলামুখ হতে হবে। বিশেষ করে নামায শুরু করার পূর্বে কিবলামুখ হয়ে দাঁড়িয়ে পরে যানবাহন অন্যমুখ হলে যথাসম্ভব কিবলামুখে ঘুরে নামায পড়তে হবে। সম্ভব না হলে যে কোন মুখেই নামায হয়ে যাবে।
সাধ্যমত নামাযের রুক্‌ন ও ওয়াজেব আদায় করতে হবে। জমার নামায হলে এবং দ্বিতীয় সময় অতিবাহিত হওয়ার আগে গাড়ি গন্তব্যস্থলে পৌঁছবে না আশঙ্কা হলে প্লেন বা গাড়িতেই নামায আদায় অপরিহার্য। (মাজাল্লাতুল বুহূসিল ইসলামিয়্যাহ্‌ ৫/১৯০)
নৌকা, পানি-জাহাজ বা স্টিমার প্রভৃতি জলযানেও নামায আদায় করা জরুরী। (কিয়ামের সময়) দাঁড়িয়ে পড়তে অসুবিধা হলে বসে বসে পড়ে নিতে হবে। ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, নবী (সাঃ) নৌকায় নামায পড়ার বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হলে তিনি বললেন, “ডুবে যাওয়ার ভয় না থাকলে তাতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নামায পড়।” (বাযয়ীফ, দারাক্বুত্বনী, সুনান,হাকেম, মুস্তাদরাক, সিফাতু স্বালাতিন নাবী (সাঃ), আলবানী ৭৯পৃ:)
আব্দুল্লাহ বিন আবী উতবাহ্‌ বলেন, ‘একদা আমি জাবের বিন আব্দুল্লাহ, আবূ সাঈদ খুদরী ও আবূ হুরাইরা (রাঃ)-এর সাথে নৌকার সঙ্গী ছিলাম। তাঁরা সকলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে জামাআত সহকারে নামায পড়লেন। তাঁদের একজন ইমামতি করলেন। আর তাঁরা তীরে আসতে সক্ষমও ছিলেন।’ (সুনান সাঈদ বিন মানসূর, আব্দুর রাযযাক, মুসান্নাফ, ইবনে আবী শাইবা, বায়হাকী ৩/১৫৫)
মহানবী (সাঃ) সফরে নিজের সওয়ারীতেই নফল ও বিত্‌র নামায পড়তেন। উটনী কেবলামুখে দাঁড় করিয়ে তকবীর দিয়ে নামায শুরু করতেন। অতঃপর পূর্ব-পশ্চিম যে মুখে পথ ও উটনী যেত, সে মুখেই তিনি নামায পড়তেন। আর এ ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়েছে মহান আল্লাহর এই বাণী :-
(فَأَيْنَمَا تُوَلُّوْا فَثَمَّ وَجْهُ الله)
অর্থাৎ, তোমরা যেদিকেই মুখ ফিরাও, সেদিকই আল্লাহর চেহারা (দিক বা কিবলাহ্‌)। (কুরআন মাজীদ ২/১১৫) (মুসলিম, সহীহ ৭০০নং, আবূদাঊদ, সুনান, তিরমিযী, সুনান)
-সলাতে মুবাসশির/আব্দুল হামিদ ফাইজি

সিজদা সাহু করার সঠিক নিয়ম

সিজদা সাহু করার সঠিক নিয়মঃ
আমাদের দেশে প্রচলিত অনেক কিছুই যেমন ইমান-আকীদা, নামায, রোযা, হজ্জ যাকাত ইত্যাদি অনেক কিছুর সাথে কুরান ও সুন্নাহর বিপরীত কাজ দেখতে পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, “প্রচার করো, একটি মাত্র আয়াত হলেও”।
যেখানে একটি মাত্র আয়াত জানলেও তা প্রচার করতে বলা হয়েছে, আর সেখানে এতো ভুল আর বেদাত দেখে চুপ করে থাকা সমীচিন বলে মনে করছিনা।
তাই, যারা সঠিক ইসলাম জানতে আগ্রহী তাদেরকে বলছি, আপনারা আমাদের পোস্টগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়বেন আর কুরআন, সহীহ হাদীস ও সত্যিকারের আলেমদের সাথে যাচাই করে দেখুন, সত্যি-মিথ্যা যাচাই বাছাই করে – যেটা হক্ক সেটা মেনে নিন। আজকে সাজদা সাহুর সঠিক নিয়ম বর্ণনা করা হলো।
_______________________________________
সিজদা সাহু সালাম ফেরানোর আগে ও পরে দুইভাবেই করা যায়। তবে আমাদের দেশে বহুল প্রচলিত মকসুদুল মুমিনীণ নামক বেদাতী বইয়ের সাজদা সাহুর নিয়ম ঠিক নয়।
আমাদের দেশে প্রচলিত ভুল নিয়মঃ
শেষ বৈঠকে শুধু আত্তাহিয়্যাতু পড়ে, শুধু ডান দিকে একবার সালাম ফিরিয়ে দুইটা সিজদা দিয়ে আবার আত্তাহিয়্যাতু দুরুদ পড়ে সালাম ফিরানোর নিয়ম - এটা ঠিকনা, কোন সহীহ হাদীসে সেজাদা সাহু এমন আসেনাই। কারো ক্ষমতা থাকলে এইরকমঃ “আত্তাহিয়্যাতু পড়ে শুধুমাত্র ডান দিকে সালাম ফিরিয়ে সিজদা সাহু দেওয়ার” পক্ষে সহীহ হাদীস থেকে দলীল পেশ করুন।
সিজদা সাহু করার সঠিক নিয়ম হচ্ছে - “সালাতে কম বেশি যাই হোক, আত্তাহিয়্যাতু, দরুদ, দুয়া মাসুরা পড়ে তাকবীর দিয়ে পর পর দুটি সিজদাহ দিয়ে সালাম ফিরিয়ে সালাত শেষ করতে হবে।”
বুখারী ও মুসলিম, মিশকাত সালাত অধ্যায় সাহো অনুচ্ছেদ, ১১৮ নাম্বার হাদীস।
অথবা, “সালাতে কম বেশি যাই হোক, সালামের ফেরানোর আগে বা পরে দুইটি (অতিরিক্ত) সাহু সিজদা দিতে হবে।”
সহীহ মুসলিম, নাওয়াতুল আওতার ৩/৪১১।
অর্থাৎ দুইটাই জায়েজ, সালামের আগে বা পরে দুইটা অতিরিক্ত সিজদা দেওয়া।
সালাম ফেরানোর আগে সিজদা সাহু যেভাবে করবেনঃ
সিজদা সাহু দেওয়া ওয়াজিব হয় এমন কোন ভুল করলে, শেষ বৈঠকে আত্তাহিয়্যাতু, দুরুদ, দুয়া মাসুরা পরে আল্লাহু আকবার বলে দুইটি সিজদা সাহু দেবেন। দুই সিজদার মাঝখানে বা সিজদাতে তাসসবীহর পরে দুয়া করতে পারবেন। ২টা অতিরিক্ত সিজদা দিয়ে আর কিছু পড়তে হবেনা, ডানে ও বামে সালাম ফিরিয়ে নামায শেষ করবেন।
সালাম ফেরানোর আগে সিজদা সাহু যেভাবে করবেনঃ
সিজদা সাহু দেওয়া ওয়াজিব হয় এমন কোন ভুল করলে, শেষ বৈঠকে আত্তাহিয়্যাতু, দুরুদ, দুয়া মাসুরা পরে ডানে ও বামে দুইদিকে সালাম ফেরাবেন। এরপরে আল্লাহু আকবার বলে দুইটি সিজদা সাহু দেবেন। দুই সিজদার মাঝখানে বা সিজদাতে তাসসবীহর পরে দুয়া করতে পারবেন। ২টা অতিরিক্ত সিজদা দিয়ে আর কিছু পড়তে হবেনা, আবার ডানে ও বামে দুইদিকেই সালাম ফিরিয়ে নামায শেষ করবেন।
তবে আমার কাছে আত্তাহিয়্যাতু ও দরুদ, দুয়া মাসুরা পড়ে দুইটা সিজদাহ সাহু দিয়ে সবার শেষে একবারে সালাম ফিরানোকেই সহজ মনে হয়, কারো ইচ্ছা হলে এমন বা অন্য নিয়মেও করতে পারেন। কিন্তু আত্তাহিয়্যাতু পড়ে একপাশে সালাম ফিরিয়ে আবার তাশাহুদ পড়ার কোনো সহীহ হাদীস নেই।
“এক পাশে সালাম ফিরানো বেদাত” – বলেছেন হানাফী বড় আলেম ইবনুল হুমাম আল-হানাফী (ফতহুল কাদীর ১/২২২ পৃষ্ঠা)।
সিজদা সাহু যে কারণে দিতে হয়ঃ
খুব কমন যে ভুলগুলো আমরা নামাযের মধ্যে করি সেগুলো ও সিজদা সাহু করার সঠিক নিয়ম বর্ণনা করা হলো –
সিজদা সাহু করার সঠিক নিয়মঃ আপনি ২ রাকাত বা ৪ রাকাতের শেষ বৈঠকে বসবেন। আত্তাহিয়্যাতু পড়ে দুরুদ শরীফ, দুয়া মাসুরা পড়বেন। এর পর কোনো সালাম না ফিরিয়ে আপনি অতিরিক্ত দুইটা সিজদা দিবেন, প্রত্যেকবার তাকবীর দিবেন সিজদার সময়ে আর, সিজদার তাসবীহ সুবহা’না রাব্বিয়াল আ’লা পড়বেন। পরে দুইদিকে সালাম ফিরিয়ে নামায শেষ করবেন।
১. ৪ রাকাত নামাযের ১ম বৈঠকে আত্তাহিয়্যাতু না পড়েই দাঁড়িয়ে গেলে কি করবেন?
উত্তরঃ দাড়াতে যাচ্ছেন কিন্তু দাড়ান নি, তাহলে আর দাড়াবেন না, বসেই যাবেন। আত্তাহিয়্যতু পড়ে বাকি নামায পুরা করবেন, কোন সিজদা সাহু দেওয়া লাগবেনা। কিন্তু, দাঁড়িয়ে গেলে আর বসবেন না, বাকি নামায শেষ করে উপরে যেই নিয়মে সিজদা সাহু দিতে বলা হয়েছে সেইভাবে সিজদা সাহু দিয়ে নামায শেষ করবেন।
২. ৪ রাকাত নামাযে ২ রাকাত শেষে সালাম ফিরিয়ে ফেললেন। এমন অবস্থায় আবার দাঁড়িয়ে যাবেন, বাকি দুই রাকাত পূর্ণ করে শেষে সিজদা সাহু দিবেন। এমনকি কেউ যদি উঠে অন্য কোথাও চলে যায় মাঝখানে কথাও বলে তবুও সে ২ রাকাত পড়ে শেষে ২টি সিজদা সাহু দিয়ে সালাম ফিরিয়ে নামায শেষ করবেন, নতুন করে ৪ রাকাত আবার পড়তে হবেনা। অনুরূপ ১ রাকাত বা ৩ রাকাত পড়ে সালাম ফিরিয়ে ফেললেও বাকি ১ রাকাত পড়ে শেষ সেজদা সাহু দিবেন।
৩. ২ বা ৪ রাকাত নামাযে কেউ যদি ভুলে অতিরিক্ত ৩য় বা ৫ম রাকাতের জন্য দাঁড়িয়ে যায় তাহলে কি করতে হবে?
উত্তরঃ অতিরিক্ত রাকাত পড়ার আগেই বুঝতে পারে বা রাকাত চলা অবস্থায় মনে পড়ে তাহলে রাকাত পূরণ না করেই বসে যেতে হবে, ইচ্ছা করে অতিরিক্ত ১ রাকাত পড়লে নামায ভেঙ্গে যাবে। বসে তাশাহুদ, দুরুদ, দুয়া মাসুরা পড়ে ২টা অতিরিক্ত সিজদা সাহু দিবেন, প্রত্যেক সিজদায় যাওয়ার আগে ও পরে স্বভাবিক নিয়মে "আল্লাহু আকবার" বলে তাকবীর দিবে। ২টা সিজদা সাহু দিয়ে আবার আত্তাহিয়্যাতু বা অন্য কিছু পড়তে হবেনা। কোনো দুয়া না পড়ে সালাম ফিরিয়ে নামায শেষ করবেন।
আর অতিরিক্ত রাকাত পড়ার পরে কিন্তু সালাম ফেরানোর আগে মনে হলে একই নিয়মে ২টা সিজদা সাহু দেবেন। আর যদি সালাম ফেরানোর পরে, এমনকি মাঝখানে অন্য কাজ বা কথা বলার পরে মনে পড়ে তাহলে যখনই মনে হবে তখন ওযু অবস্থায় কিবলামুখী হয়ে সরাসরি আল্লাহু আকবার বলে ২টা সিজদা দিবেন, ২টা সিজদা সাহু দিয়ে ডানে বামে সালাম ফেরাবেন, আগে বা পরে কোনো কিছু পড়তে হবেনা।
৪. রুকু দুইবার বা সিজদা তিনবার করে ফেললেন। বাকি নামায পূর্ণ করে শেষে সিজদা সাহু দিবেন।
৫. কোনো এক রাকাতে রুকু, সিজদায় উলটা পাল্টা করলেন অর্থাত দিলেন না, বা সুরা ফাতেহা পড়েন নাই। এইগুলো নামাযের রুকন, এইগুলো ছাড়া এক রাকাত হয় না। এইরকম কোনো রুকন ছুটে গেলে ঐ রাকাত নামাযের মধ্যে গণ্য হয়না। এইজন্য আপনি পুরো নামায বাদ দিবেন না। ধরুন ৪ রাকাত পড়ছেন, তাহলে বাকিগুলো ঠিক থাকবে, আপনি চতুর্থ রাকাতের বৈঠকের পর সালাম না ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে যাবেন, এক রাকাত অতিরিক্ত পড়ে শেষ বৈঠক করে সিজদা সাহু দিবেন।
৬. নামায ২ রাকাত না ৩ রাকাত পড়া হলো সেটা নিয়ে বা কোনো কিছু একটা করেছেন কিনা সন্দেহ দেখ দিলে প্রথম দ্রুত সিদ্ধান্ত নিবেন কোনটা আপনার কাছে বেশি মনে হচ্ছে, ২ রাকাত না ৩ রাকাত। যেটা মনে বেশি জোরালো হবে সেটাকেই ধরবেন আর অন্যটার চিন্তা মাথা থেকে বাদ দিবেন। আপনি এইভাবে নামায পূর্ণ করবেন আর শেষে সিজদা সাহু দিবেন। আর যদি ২ রাকাত না ৩ রাকাত কোনোটার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে না পারেন, তাহলে কম রাকাত অর্থাৎ এই ক্ষেত্রে ২ রাকাত ধরে নামায পূর্ণ করবেন আর শেষে সিজদা সাহু দিবেন।
৭. ১ম/৩য় রাকাতে যদি না দাঁড়িয়ে বসে যান তাহলে কি করবেন?
উত্তরঃ কিছুইনা - মনে হলে দাড়িয়ে যাবেন, বাকি নামায শেষ করবেন কোন সাহু সিজদা লাগবেনা। আর যদি বৈঠক করে ফেলেন অর্থাৎ আত্তাহিয়্যাতু পড়া শেষ তাহলে শেষ বৈঠকে সিজদা সাহু দেবেন। উল্লেখ্য, ১ম ও ৩ইয় রাকাতের ২ সিজদার পরে উঠার আগে সরাসরি না উঠে একটু বসে পরে উঠা সুন্নত - একে প্রশান্তির বৈঠক বলা হয়।
***আমি চেষ্টা করেছি সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, অন্য হাদীসে কিতাব ও ফিকহের কিতাব যেমন নায়লুল আওতার, ফাতওয়া আরকানুল ইসলাম, নামাযের উপর বই থেকে সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলার জন্য। কারো বুঝতে সমস্যা হলে, তাহলে এই পোস্ট নিয়ে সন্দেহের মাঝে পড়বেন না, আগে যা করতেন তাই করবেন, নতুনটা করতে গিয়ে বিপদে পড়বেন না। সঠিক না জানা বা বুঝতে সমস্যা হলে কেউ যদি অনিচ্ছাকৃভাবে ভুলভাবে করতে বাধ্য হন, ইন শা’ আল্লাহ তাতে কোন দোষ হবেনা।

ওযু


ওযু সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনাঃ

ওযুর ফরয হচ্ছে ৬টি
১. কুলি করা, নাকে পানি দেয়া ও নাক ঝাড়াসহ সমস্ত মুখমন্ডল ভালোভাবে ধৌত করা।
২. কনুইসহ দুইহাত ধৌত করা।
৩. ভেজা হাতে কানসহ মাথা মাসাহ করা।
৪. টাখনুসহ দুই পা ধৌত করা।
৫. যে তারতীব বা ধারা্বাহিক নিয়ম বর্ণনা করা হলো (মুখ, হাত, পা, মাথা মাসাহ) – এইভাবে করা, আগে বা পরে না করা।
৬. এগুলো পরপর করা অর্থাৎ একটা কাজের পরে অন্য আরেকটা কাজ করতে এমন বিরতি না দেয়া যে আগের ধৌত করা অংগ শুকিয়ে যায়।
ফতওয়াহঃ আল্লামাহ শায়খ আব্দুল আজীজ বিন বাজ (রহঃ)।

যেমনটা আল্লাহ বলেছেনঃ
হে ঈমানদারগণ! তোমরা যখন নামাযের জন্য প্রস্তুত হও, তখন তোমাদের মুখমন্ডল ও দুইহাত কনুই পর্যন্ত ধৌত কর এবং তোমাদের মাথা মাসাহ করা ও দুইপা টাখনু পর্যন্ত ধৌত কর। সু(সুরা আল-মায়িদাঃ ৬
এই আয়াতের বর্ণিত কাজগুলো ছাড়া বাকি সবগুলো কাজ সুন্নত।

ওযু করার সুন্নতী পদ্ধতিঃ
১. প্রথমে পবিত্রতা অর্জনের জন্য অন্তরে নিয়ত করে নিতে হবে। এর জন্য কোনো দুয়া পড়তে হবেনা বা মুখে কোনো কিছু বলতে হবেনা। নিয়ত অর্থ হচ্ছে কোন কাজ করতে ইচ্ছা করা বা সংকল্প করা। আমি পবিত্রতা অর্জন করার জন্য ওযু করছি” - অন্তরে শুধুমাত্র এই ধারণা বা ইচ্ছা থাকলেই নিয়ত করা হয়ে যাবে। প্রত্যেক কাজের শুরুতে নিয়ত করা ফরয। (সহীহ বুখারীঃ  ১) 
নিয়ত করার জন্য নাওয়াইতু...এইরকম মুখে উচ্চারণ করে কোনো দুয়া পড়া বেদাত, সুতরাং সেটা করা যাবেনা।

২. অতঃপর বিসমিল্লাহবলে ওযু করা শুরু করতে হবে।
আবু দাউদঃ১০১, তিরমিযীঃ ২৫।
ওযু বা গোসলের পূর্বে বিসমিল্লাহ বলে শুরু করা সুন্নত, ফরয নয়। সবসময় চেষ্টা করতে হবে বলার জন্য, তবে শুরুতে বিসমিল্লাহ বলতে ভুলে গেলেও ওযু/গোসল হয়ে যাবে। আর বাথরুমে ওযু করলেও বিসমিল্লাহ বলবে।
উল্লেখ্য, শুধু বিসমিল্লাহবলাই সুন্নত, বিসমিল্লাহ-হির রাহমানীর রাহীম পুরোটা নয়।

৩. ডান হাতে পানি নিয়ে দুই হাতের কব্জি পর্যন্ত তিনবার ধৌত করতে হবে। এসময় হাতের আংগুলগুলো খিলাল করতে হবে।
আবু দাউদ, মিশকাতঃ ৪০১, নাসায়ী মিশকাতঃ ৪০৫।
এসময় হাতে আংটি থাকলে রাসুলুলাহ (সাঃ) সেটা নাড়িয়ে ধৌত করতেন।
ফিকহুস সুন্নাহঃ ১/৬১।
উল্লেখ্য, হাত কব্জি পর্যন্ত না ধোয়া পর্যন্ত ওযুর পানিতে হাত দেয়া যাবেনা। কারণ ঘুমের সময় তার হাত কোথায় ছিলো কেউ জানেনা। অথবা, হাতে কোনো নাপাকী থাকলে ওযুর পানিও নাপাক হয়ে যাবে। এইজন্য, কব্জি পর্যন্ত হাত না ধোয়া পর্যন্ত ওযুর পানিতে হাত দেয়া নিষিদ্ধ।
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত যে, নবী (সাঃ) বলেছেন, তোমাদের কেউ নিদ্রা থেকে জাগ্রত হলে সে যেন তার হাত তিনবার না ধোয়া পর্যন্ত পানিতে না ঢোকায়। কেননা তোমাদের কারো জানা নেই যে, তার হাত রাতে কোথায় পৌঁছেছিল। (নাসাঈ)

৪. ডান হাতে এক আজলা পরিমান পানি নিয়ে অর্ধেক পানি দিয়ে কুলি করবে আর বাকি অর্ধেক পানি নাকে দিয়ে নাক পরিষ্কার করবে ও বাম হাতে নাক ঝাড়বে।
এসময় ভালো করে কুলি করে মুখের সব অংশে এবং নাকের উপরের অংশ পর্যন্ত পানি পৌঁছাতে হবে।
অধিকাংশ মানুষ আগে কুলি করে পরে নাকে পানি দেয় এটা ঠিকনা। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ডান হাতে পানি নিয়ে অর্ধেক পানি দিয়ে কুলি করতেন বাকি অর্ধেক পানি দিয়ে নাক পরিষ্কার করতেন, অর্থাৎ কুলি করা ও নাক ধোয়া একই সাথে করতেন।
আবু দাউদঃ ২৩৬৬, তিরমিযীঃ ৭৮৮।

৫. কপালের গোড়া থেকে দুই কানের লতি পর্যন্ত ও থুতনীর নিচ পর্যন্ত সমস্ত মুখমন্ডল ধৌত করবে।
বুখারী ও মুসলিম।
পুরুষদের মধ্যে যাদের দাড়ি ঘন তাদের ভেজা হাতে দাড়ি খিলাল করলেই হবে। আর যাদের দাড়ি হালকা বা মুখের সাদা চামড়া দেখা গেলে পানি পৌছানো ওয়াজিব। আর নারী বা যদের দাড়ি নেই তারা এক অঞ্জলি পানি থুতনীর নিচে দিবে, সেটাও মুখের অন্তর্ভুক্ত, তবে গলা ধৌত করবে না।

৬. প্রথমে ডান হাত ও পরে বাম হাত কনুইসহ ধৌত করবে। হাতের আঙ্গুলের অগ্রভাগ থেকে অন্তত কনুই পর্যন্ত ধোয়া ওয়াজিব, তবে সতর্কতাবশত একটু বেশি অংশ ধৌত করা ভালো।

৭. মাথা মাসাহ করা
মাথা মাসাহ করা সঠিক নিয়মঃ
ইমানের পরেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হলো সালাতবা নামায। অথচ, আমাদের ব্যক্তিগত উদাসীনতা, স্বল্পশিক্ষিত হুজুর আর নূরানী নামায শিক্ষানামক বইয়ের ভুল শিক্ষার কারণে সালাতে আমাদের মাঝে কত ভুল বিদ্যমান। মাথা মাসাহ করা নিয়ে আমাদের মাঝে যে ভুল গুলো প্রচলিত সেগুলো নিয়ে আলোচনা করা হলো।
প্রথম কথা হলো, মাথা মাসাহ করতে হবে একবার, তিনবার না। 
আল্লাহর রাসুল (সাঃ) ওযুর অংগসমূহ কখনো একবার, কখনো দুইবার আবার কখনও তিনবারও ধৌত করতেন। কিন্তু মাথা মাসাহ করতেন একবার। (দেখুন মিশকাত, হাঃ ৩৯৩-৩৯৪)
দ্বিতীয়ত, মাথা মাসাহ করার সময় ঘাড় মাসাহ করা বেদাত। ইমাম আন-নববী (রহঃ) বলেন, “এ ব্যপারে হাদীস জাল ও এটা করা সুন্নত নয় বেদাত।
নায়লুল আওতার ১/১৬৩ পৃষ্ঠা, মাজমু ফাতওয়া ১/৫৬, যাদুল মায়াদ ১/১৮৭।
রাসুল (সাঃ) কখনোই ঘাড় মাসাহ করতেন না, তাই ঘাড় মাসাহ করা রাসুল (সাঃ) তরীকার বিরোধী যা নিঃসন্দেহে পরিত্যাজ্য।
তৃতীয় ভুলঃ নূরানী নামায শিক্ষা বা মকসুদুল মুমিনীন এই সমস্ত বইয়ে একটা কথা লেখা থাকে, মাথার চার ভাগের এক ভাগ বা তিন ভাগের এক ভাগ মাসাহ করা ফরয। এই কথার কোনো ভিত্তি নেই, বরং রাসুল (সাঃ) সমস্ত মাথাই মাসাহ করতেন। সুতরাং সমস্ত মাথা মাসাহ করাই ফরয।

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) যেভাবে মাথা মাসাহ করতেনঃ
তিনি (সাঃ) দুই হাতের ভেজা আংগুল দিয়ে মাথার সামনে হতে পেছনে ও পুনরায় পেছন থেকে সামনে বুলিয়ে পুরো মাথা একবার মাসাহ করতেন। একই সাথে ভেজা শাহাদাত আঙ্গুল দিয়ে কানের ভেতর অংশ এবং বুড়ো আংগুল দিয়ে কানের বাইরের অংশ মাসাহ করতেন।
মাথায় পাগড়ি/স্কার্ফ থাকলে পাগড়ির উপরে ভেজা হাত দিয়ে সমস্ত মাথা মাসাহ করে নিতে হবে।

৮. প্রথমে ডান পা ও পরে বাম পা টাখনুসহ ভালোভাবে ধৌত করতে হবে। বাম হাতের আংগুলগুলো দিয়ে পায়ের আঙ্গুলগুলো খিলাল করতে হবে। এসময় খেয়াল রাখতে হবে, পুরো পা যেনো ভালোভাবে ধৌত করা হয়, অনেকের পায়ের গিটের নিচে পুরো অংশ পানি দিয়ে ধৌত করা হয়না। এরকম করলে জাহান্নামে যেতে হবে, কারণ এই কারণে ওযু হয়না।
শীতকালে বা সফরে ওযু থাকা অবস্থায় মোজা পড়লে মোজা খুলে পা ধৌত করতে হবেনা, মোজার উপরে একবার মাসাহ করলেই হবে। আর চামড়া বা কাপড় যেকোনো মোজাতেই মাসাহ করা যাবে (তিরমিযী)।
মাসাহ করার নিয়মঃ দুই হাতে ভেজা আঙ্গুল পায়ের পাতা হতে টাখনু পর্যন্ত টেনে এনে একবার মাসাহ করতে হবে।
মুসলিম, মিশকাত ৫১৮।
ডান হাত দিয়ে ডান পা ও বাম হাত দিয়ে বাম পা মাসাহ করতে হবে।

ওযু এখানেই সমাপ্ত। ওযুর পরে সুন্নত হচ্ছেঃ
১. রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ওযু শেষে একটু পানি নিয়ে লজ্জাস্থান বরাবর ও আশেপাশের কাপড়ে পানি ছিটিয়ে দিতেন।
আবু দাউদ, নাসায়ী, মিশকাত ৩৬১, সহীহঃ আলবানী।
কারণ, শয়তান মানুষকে ওয়াসওয়াসা দেয় যে, তোমার পেশাবের ফোঁটা বের হয়েছে। এই কাজ করলে এই ওয়াসওয়াসা দূর হবে। 
২. ওযু শেষ করে কালিমা শাহাদাত একবার পড়তে হবে,

أَشْهَدُ أَنْ لاَ إِلَـهَ إِلاَّ اللهُ وَحْدَهُ لاَ شَرِيْكَ لَهُ وَأَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ.

উচ্চারণঃ আশহাদু আল্-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহ্দাহু লা শারিকা-লাহু ওয়াআশ্হাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহু।
অর্থঃ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া আর কোন মাবূদ নেই, তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই এবং আমি আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (সঃ) তাঁর বান্দা ও রাসূল।
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন যে ব্যক্তি পূর্ণভাবে ওযু করবে এবং কালিমা শাহাদাত পাঠ করবে, তার জন্য জান্নাতের আটটি দরজাই খুলে দেয়া হবে। সে যেটা দিয়ে ইচ্ছা প্রবেশ করতে পারবে
মুসলিম ১/২০৯, মিশকাতঃ ২৮৯।
এসময় আকাশের দিকে তাকানোর প্রয়োজন নেই, এ সম্পর্কিত হাদীস মুনকার বা যঈফ।
শায়খ আলবানী, ইরোয়াউল গালীল ১/১৩৫।
৩. এছাড়া আরো একটি দুয়া পড়া যায়, যেমন

اَللَّهُمَّ اجْعَلْنِيْ مِنَ التَّوَّابِيْنَ وَاجْعَلْنِيْ مِنَ الْمُتَطَهِّرِيْنَ.

উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মাজ আলনী মিনাত তাওয়্যাবীনা ওয়াজ আলনী মিনাল মুতা-ত্বাহহিরীন।
অর্থঃ হে আল্লাহ, তুমি আমাকে তওবাকারী ও পবিত্রতা অর্জনকারীদের অন্তর্ভুক্ত করো।
তিরমিযী ১/৭৯।
৪. ওযুর পরে ২ রাকাত নামায পড়া। এই নামায নফল, তবে এর অনেক মর্যাদা রয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি আমার দেখানো এই পদ্ধতিতে ওযু করে মনের মধ্যে অন্য কোনো চিন্তা করা ছাড়া ২ রাকাত নামায পড়ে, ঐ ব্যক্তির আগের সমস্ত গুনাহ মাফ হয়ে যাবে।  (বুখারীঃ ১৫৯)
মুসলিম অন্য হাদীসে বর্ণনা করেছেনঃ রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ ঐ ব্যক্তির জন্য জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে। (মুসলিমঃ ২২৬)
উল্লেখ্যঃ এইখানে সমস্ত গুনাহ মাফ হয়ে যাবে ও জান্নাত ওয়াজিব হয়ে যাবে এর জন্য শর্ত হলো নামাযে নামায ছাড়া অন্য কোনো কিছু চিন্তা করা যাবেনা। তাই এই নামাযের পূর্ণ ফযীলত পেতে হলে সেইদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

ওযুর মধ্যে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ঃ
### ওযুর জায়গা নখ পরিমান শুকনো থাকলে ওযু হবেনা।
সহীহ তিরমিযী ৪১।
এইজন্য আস্তে ধীরে মনোযোগের সহিত সুন্দর করে ওযু করতে হবে। তাড়াহুড়া করে অন্য চিন্তা মাথায় নিয়ে ওযু করা অনুচিত, কারণ এতে যদি ওযু না হয় তাহলে নামাযই কবুল হবেনা! তাই আমাদের উচিত ওযু করার সময় খেয়াল রাখা।
১. ওযুর অংগগুলো একবার, দুই বার বা তিনবার ধৌত করতে হবে। একবার করা ফরয, সর্বোচ্চ তিনবার করা উত্তম। তবে মাথা মাসাহ বা পায়ে মোজা থাকলে পা মাসাহ একবারই করতে হবে। তিনবারের বেশি করা বাড়াবাড়ি হাদীসে এই কাজের কড়া সমালোচনা করা হয়েছে।
বুখারী ও মুসলিম, মিশকাত ৩৯৫- ৩৯৭।
২. পানি অপচয় করা যাবেনা। টেপ ছেড়ে ওযু করা পানি অপচয়ের মধ্যে পড়বে। উচিত হচ্ছে মগে বা কোনো পাত্রে পানি নিয়ে ওযু করা। আর রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ওযু করতেন এক মুদ বা ৬২৫ গ্রাম পানি দিয়ে (প্রায় পৌনে এক লিটার).
বুখারী ও মুসলিম, মিশকাত ৪৩৯।
৩. ওযু শেষে ভেজা অংগ গুলো তোয়ালে দিয়ে মুছে ফেলা জায়েজ রয়েছে।
ইবনে মাজাহ ৪৬৫, ৪৬৮।
৪. এক ওযু দিয়ে পরের ওয়াক্তের নামায পড়া জায়েজ তবে রাসুলুল্লাহ (সাঃ) সবসময় নতুন করে ওযু করে নিতেন। মক্কা বিজয়ের দিন তিনি একবার এক ওযু দিয়ে দুই ওয়াক্তের নামায পড়েছিলেন।
৫. কাপড়ের মোজার উপরে মাসাহ করা জায়েজ। তিরমিযীতে এর পক্ষে সহীহ হাদীস রয়েছে। যারা বলে শুধু চামড়ার মোজার উপরে মাসাহ করা যাবে তারা ভুল বলেন।

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ও সাহাবায়ে কেরামগণ (রাঃ) খুফ (চামড়ার মোজা) ও জাওরাবের (সুতী বা পশমী মোটা মোজার) উপরে মাসাহ করতেন।
বুখারী, মুসলিম, আবু দাউদ, তিরমিযী, মিশকাত ৫৩-৫৪।
মুকীম বা গৃহে অবস্থান করলে একদিন একরাত (২৪ঘন্টা) সফরে তিনিদিন ও তিনরাতে পর্যন্ত একবার মোজা পড়ে মাসাহ করে যাবে, এর পরে ওযু করলে মোজা খুলে ধৌত করতে হবে।
## এমন জুতা যা টাখনু ঢাকে সেটা যদি পাক থাকে আর ওযু করা অবস্থায় পড়া হয়, তাহলে তার উপরেও মাসাহ করা জায়েজ।
আহমাদ, তিরমিযী, মিশকাত ৫২৩।
জুতার নিচে নাপাকী থাকলে তা মাটিতে ভালোভাবে ঘষে নিলে পাক হয়ে যাবে এবং ঐ জুতার উপরে মাসাহ করা চলবে।
আবু দাউদ, মিশকাত ৫০৩। 
৬. শরীরে কোনো জখম বা ব্যান্ডেজ থাকলে ঐ অংশটুকুর উপরে ভেজা হাতে একবার মাসাহ করলেই হবে, ধৌত করতে হবেনা।
 সহীহ ফিকহুস সুন্নাহ ১/১৬১।
৭. ওযুর শুরুতে প্রয়োজনীয় কথা বলতে ও সালাম দিতে বা নিতে হাদীসে কোনো নিষেধ নেই।
৮. প্রত্যেক অংগ ধোঁয়ার সময় আলাদা আলাদ দুয়া এইগুলো বেদাত। এইগুলো না রাসুলুল্লাহ (সাঃ) পড়েছেন, না সাহাবার করেছেন না চার ইমাম থেকে কোনো বক্তব্য আছে। যাদুল মায়াদ ১/৮৮।
৯. শরীরের যেকোনো স্থান থেকে কম হোক আর বেশি হোক রক্ত বের হলে ওযু নষ্ট হবেনা।
বুখারী, ২৯ পৃষ্ঠা।
১০. কাপড় চেঞ্জ করলে বা হাটুর উপরে কাপড় উঠে গেলে ওযু ভেঙ্গে যায়না।
১১. বমি হলে, নামাযের ভেতরে বা বাইরে উচ্চস্বরে হাসলে, মৃত ব্যক্তিকে গোসল দিলে বা বহন করলে ওযু ভেঙ্গে যায়না।
আরো কিছু কারণ যেই কারণে ওযু ভংগ হয়নাঃ

ওযু সম্পর্কে মাসয়া'লাঃ
১) আয়নাতে নিজের চেহারা দেখলে ওযু ভাংবেনা।
২) হাটুর উপরে কাপড় উঠে গেলে বা কাপড় চেঞ্জ করলে ওযু ভাংবেনা।
৩) বাচ্চাকে দুধ খাওয়ালে ওযু ভাংবেনা।
৪) নারীরা মাথায় কাপড় না দিয়েও ওযু করতে পারবে, তবে পরপুরুষের সামনে হলে ঢেকে রাখতে হবে।
৫) টিভি দেখলে বা নারীরা পরপুরুষকে বা পরুপুরুষ নারীকে দেখলে ওযু ভাংবেনা। তবে হারাম কোনো কিছু দেখলে বা দৃষ্টিপাত হয়ে থাকলে অবশ্যই গুনাহ হবে, কিন্তু এতে ওযু ভাংবেনা। 
***উপরের একটাও ওযু ভংগের কারণ নয়।


ওযু নষ্টের কারণগুলো কি কি?
এ সম্পর্কে বিদ্বানদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। ওযু নষ্টের কারণ হিসেবে দলীলের ভিত্তিতে যা প্রমাণিত হবে, আমরা সেটাই এখানে আলোচনা করব। ওযু ভঙ্গের কারণ সমূহ নিম্নরূপঃ

প্রথমতঃ  পেশাব-পায়খানাররাস্তা দিয়ে কোন কিছু নির্গত হওয়া। চাই তা পেশাব, পায়খানা, বীর্য, বায়ু বা মযী বা অন্যকিছু হোক- বের হলেই তা ওযু ভঙ্গের কারণ হিসেবে গণ্য হবে। এ ব্যাপারে প্রশ্নের কোন অবকাশনেই। কিন্তু বীর্য যদি উত্তেজনার সাথে বের হয়, তবে সকলের জানা যে, তখন গোসল ওয়াজিবহবে। কিন্তু মযী বের হলে অন্ডকোষসহ পুরুষাঙ্গ ধৌত করে শুধু ওযু করলেই চলবে।

দ্বিতীয়তঃ  নিদ্রা যদি এমন অধিক পরিমাণে হয়, যাতে ওযু ভঙ্গ হয়েছে কিনা অনুভুতি না থাকে, তবে তা ওযু ভঙ্গেরকারণ। কিন্তু নিদ্রা অল্প পরিমাণে হলে ওযু ভঙ্গ হবে না। কেননা এ অবস্থায় ওযু ভঙ্গ হলেসাধারণতঃ অনুভব করা যায়। চাই চিৎ হয়ে শুয়ে নিদ্রা যাক বা হেলান ছাড়া বসে বা হেলান দিয়ে বসে নিদ্রাযাক। মোট কথা অন্তরের অনুভুতি উপস্থিত থাকা। কিন্তু যদি এমন অবস্থায় পৌঁছে যায়, যাতেকোন কিছু বুঝতে পারে না, তবে ওযু করা ওয়াজিব। কারণ হচ্ছে, নিদ্রা মূলতঃ ওযু ভঙ্গেরকারণ নয়; বরং এ সময় ওযু ভঙ্গের সম্ভাবনা থাকে। অতএব অনুভুতি থাকাবস্থায় যেহেতু ওযুভঙ্গ হওয়ার সম্ভাবনা নেই, তাই নিদ্রা এলেই ওযু ভঙ্গ হবে না। নিদ্রা যে মূলতঃ ওযু ভঙ্গেরকারণ নয় তার দলীল হচ্ছে, অল্প নিদ্রাতে ওযু ভঙ্গ হয় না। নিদ্রা গেলেই যদি ওযু ভঙ্গহত, তবে নিদ্রা অল্প হোক বেশী হোক ওযু ভঙ্গ হওয়ার কথা। যেমনটি পেশাব অল্প হোক বেশীহোক ওযু ভঙ্গ হবে।

তৃতীয়তঃ উটের গোশত ভক্ষণ করা। উটের গোসত রান্না করে হোক, কাঁচা হোক খেলেই ওযু ভঙ্গ হয়ে যাবে। কেননাজাবের বিন সামুরা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হল, আমরা কি ছাগলের গোশত খেয়ে ওযু করব? তিনি বললেন, যদি ইচ্ছা হয় তাহলেকরতে পার (না করলেও চলবে)।. বলা হল, আমরা উটের গোশত খেয়ে কি ওযু করব? তিনি বললেন,“হ্যাঁ।. নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন ছগালের গোশতখেয়ে ওযু করার বিষয়টি মানুষের ইচ্ছাধীন রেখেছেন, তখন বুঝা যায় উটের গোস্ত খেয়েওযুর ব্যাপারে মানুষের কোন ইচ্ছা স্বাধীনতা নেই। অবশ্যই ওযু করতে হবে। অতএব উটের গোস্তকাঁচা হোক বা পাকানো হোক কোন পার্থক্য নেই, গোস্ত লাল বর্ণ হোক বা অন্য বর্ণ খেলেইওযু ভঙ্গ হবে। উটের নাড়ী-ভুঁড়ি, কলিজা, হৃতপিন্ড, চর্বি, মোটকথা উটের যে কোন অংশ ভক্ষণকরলে ওযু ভঙ্গ হবে।

ওযুর উপরে শায়খ সাইফুদ্দিন বেলাল এর ছোট্ট এই লেকচারটি খুবই সুন্দর ও উপকারী।


ঈমানের শাখা সমূহ কি কি?

ঈমানের শাখা সমূহ কি কি?
_______________________

প্রশ্নঃ আলেমগণ ঈমানের যে সমস্ত শাখা বর্ণনা করেছেন তার সারাংশ বর্ণনা করুন।

উত্তরঃ  ইবনে হিব্বান (রহঃ) কর্তৃক বর্ণিত ঈমানের শাখাগুলো হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী (রহঃ) সহীহ বুখারীর ব্যাখ্যাগ্রন্থ ফতহুল বারীতে সংক্ষিপ্তভাবে বর্ণনা করেছেন।

এই শাখাগুলো তিন প্রকার। যথাঃ
১. এমন কিছু শাখা আছে যা অন্তরের সাথে সম্পৃক্ত।
২. কিছু শাখা আছে যা জবানের সাথে সম্পৃক্ত এবং
৩. এমন কিছু শাখা রয়েছে, যা শরীরের সাথে সম্পৃক্ত।

প্রথমত, অন্তরের কাজসমূহঃ
নিয়ত ও বিশ্বাস হচ্ছে অন্তরের কাজ। ঈমানের যেসমস্ত শাখা অন্তরের সাথে সম্পৃক্ত তার সংখ্যা ২৪টি। নিম্নে তা বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হল।
১. আল্লাহর প্রতি ঈমান। আল্লাহর যাত (স্বত্তা), সিফাত (গুণাবলী) এবং একত্ববাদের প্রতি ঈমান আনয়নও আল্লাহর প্রতি ঈমানের অন্তর্ভূক্ত। তবে স্মরণ রাখা জরুরী যে, আল্লাহ্ স্বীয় সত্বা ও গুণাবলী কোন সৃষ্টির মত নয়। আল্লাহ তা’আলা বলেনঃ
لَيْسَ كَمِثْلِهِ شَيْءٌ وَ هُوَ السَّميْعُ الْبَصِيْر
“কোন কিছুই তাঁর অনুরূপ নয়। তিনি শুনেন এবং দেখেন।”
সূরা শুরাঃ ১১।
২. এই বিশ্বাস করা যে, আল্লাহ্ ব্যতীত অন্যান্য সকল বস্তুই ধ্বংসশীল।
৩. এমনিভাবে আল্লাহর ফেরেশতা
৪. আসমানী কিতাব
৫. নবী-রাসূল
৬. তাকদীরের ভাল ও মন্দ এবং
৭. আখেরাতের প্রতি ঈমান। কবরের প্রশ্নোত্তর, পুনরুত্থান, হিসাব, আমলনামা প্রদান, মীযান (দাঁড়িপাল্লা), পুলসিরাত, জান্নাত এবং জাহান্নামের প্রতি ঈমান আনয়ন করাও অন্তরের কাজ সমূহের অন্তর্ভূক্ত।
৮. আল্লাহকে ভালবাসা, আল্লাহর জন্যেই কাউকে ভালবাসা, আল্লাহর জন্যেই কাউকে ঘৃণা করা।
৯. নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে ভালবাসা ও তাঁকে সম্মান করাও অন্তরের কাজ। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামএর উপর দরূদ পাঠ ও তাঁকে ভালবাসা ও সম্মান প্রদর্শন তার অন্তর্ভূক্ত।
১০. তাঁর সুন্নাতের অনুসরণ করা
১১. একনিষ্ঠতার সাথে আল্লাহর এবাদত করা আবশ্যক-এর প্রতি ঈমান আনয়নও অন্তরের কাজের অন্তর্ভূক্ত। “রিয়া” তথা লোক দেখানো আমল ও মুনাফেকী পরিহার করাও এর অন্তর্ভূক্ত।
১২. তাওবা করা
১৩. আল্লাহকে ভয় করা
১৪. আল্লাহর রহমতের আশা রাখা
১৫. আল্লাহর নেয়ামতের শুকরিয়া আদায় করা
১৬. ওয়াদা বা অঙ্গিকার পূর্ণ করা
১৭. ধৈর্য ধারণ করা
১৮. তাকদীরের লিখনের উপর সন্তুষ্ট থাকা
১৯. আল্লাহর উপর ভরসা করা
২০. বিনয়-নম্রতা প্রদর্শ করা, বড়কে সম্মান করা ও ছোটকে স্নেহ করাও এর অন্তর্ভূক্ত।
২১. অহঙ্কার ও তাকাব্বরী বর্জন করা
২২. হিংসা বর্জন করা
২৩. কাউকে ঘৃণা না করা এবং
২৪. ক্রোধ বর্জন করা।

দ্বিতীয়ত, জবানের কাজসমূহ তথা জবান দ্বারা উচ্চারিত শব্দ ও বাক্যসমূহঃ
ঈমানের শাখাসমূহের মধ্যে থেকে যেগুলোর সম্পর্ক জবানের সাথে তার সংখ্যা হল সাতটি। যথা-
১. তাওহীদের বাক্য অর্থাৎ মুখে “লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ্” উচ্চারণ করা
২. কুরআন তেলাওয়াত করা
৩. ইলম শিক্ষা করা
৪. অপরকে ইলম শিক্ষা দেয়া
৫. দু’আ করা
৬. যিকির করা এবং ক্ষমা প্রার্থনা করাও এর অন্তর্ভূক্ত
৭. অযথা কথা-বার্তা থেকে বিরত থাকা।

তৃতীয়ত, শরীরের কাজসমূহঃ
ঈমানের শাখাসমূহের মধ্যে থেকে যেগুলোর সম্পর্ক শরীরের সাথে, তার সংখ্যা হল ৩৮টি। এ শাখাগুলো আবার তিন ভাগে বিভক্ত। যথা-

ক. কতিপয় শাখা ব্যক্তি বিশেষের সাথে সম্পৃক্ত। এগুলোর সংখ্যা পনেরটি। যথা-
১. বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ পবিত্রতা অর্জন করা
২. মিসকীন ও অসহায়কে খাদ্য দান করা
৩. মেহমানকে সম্মান করা
৪. ফরজ রোজা পালন করা
৫. নফল রোযা পালন করা
৬. ইতেকাফ করা
৭. লাইলাতুল কদর অন্বেষণ করা
৮. হজ্জ পালন করা
৯. উমরা পালন করা
১০. কাবা ঘরের তাওয়াফ করা
১১. দ্বীন ও ঈমান নিয়ে টিকে থাকার জন্যে হিজরত বা দেশ ত্যাগ করা
১২. দ্বীন ও ঈমান বাঁচানোর জন্যে কাফের রাষ্ট্র ত্যাগ করে ইসলামী রাজ্যে চলে যাওয়া
১৩. মানত পূর্ণ করা
১৪. ঈমান বৃদ্ধির চেষ্টা করা ও
১৫. কাফফারা আদায় করা।

খ. কতিপয় শাখা আছে, যা ব্যক্তির সাথে সংশ্লিষ্টদের সাথে সম্পৃক্ত। এগুলোর সংখ্যা মোট ৬টি। যথা-
১. বিবাহের মাধ্যমে চরিত্র পবিত্র রাখা
২. পরিবারের জন্য ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করা
৩. পিতা-মাতার সেবা করা, তাদের অবাধ্য না হওয়া
৪. সন্তান প্রতিপালন করা
৫. আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা
৬. মনিবের প্রতি অনুগত থাকা ও অধীনস্তদের সাথে নরম ব্যবহার করা।

গ. এমন কতিপয় শাখা রয়েছে,যা সকল মুসলমানের সাথে সম্পৃক্ত। এগুলোর সংখ্যা হচ্ছে ১৭টি। যথা-
১. ইনসাফের সাথে রাষ্ট্র পরিচালনা করা
২. মুসলিম জামাআতের অনুসরণ করা,
৩. শাসকদের আনুগত্য করা
৪. মানুষের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ মিটিয়ে দেয়া। বিশৃংঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাও এর অন্তর্ভূক্ত।
৫. সৎকাজে পরস্পর সহযোগিতা করা, সৎকাজের আদেশ দেয়া এবং অসৎকাজের নিষেধ করাও এর অন্তর্ভূক্ত।
৬. “হুদুদ” বা দণ্ডবিধি কায়েম করা।
৭. আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ করা ও ইসলামী রাষ্ট্রের সীমানা পাহারা দেয়াও জেহাদের অন্তর্ভূক্ত।
৮. আমানত আদায় করা এবং গণীমতের মালের পাঁচভাগের একভাগ আদায় করাও এর অন্তর্ভূক্ত।
৯. ঋণ পরিশোধ করা
১০. প্রতিবেশীকে সম্মান করা
১১. মানুষের সাথে ভাল ব্যবহার করা
১২. হালালভাবে সম্পদ উপার্জন করা এবং বৈধ পন্থায় তা খরচ করা এবং অপচয় না করা
১৩. সালামের উত্তর দেয়া
১৪. হাঁচি দানকারীর উত্তর প্রদান করা
১৫. মানুষের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকা
১৬. খেলা-তামাশা থেকে বিরত থাকা ও
১৭. রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক জিনিষ সরিয়ে দেয়া।

এই হল ঈমানের ৬৯টি শাখা। কতিপয় শাখাকে অন্য শাখার সাথে একত্রিত গণনা না করে আলাদাভাবে হিসাব করলে ৭৭টি হবে। আল্লাহই ভাল জানেন।

উৎসঃ কুরআন ও সহীহ হাদীসের আলোকে দু শতাধিক প্রশ্নোত্তরে নাজাত প্রাপ্ত দলের আকীদা শীর্ষক কিতাব থেকে (প্রশ্ন নং-১৫৮)।
লেখকঃ হাফেজ হাকামী (রহঃ)

অনুবাদকঃ আব্দুল্লাহ শাহেদ মাদানী